সাম্প্রতিক অর্থবছরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান গন্তব্য হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে শুধু জনশক্তি রপ্তানিই নয়, ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস প্রবাসী আয়ও চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়েন ৯ লাখ ৬৯ হাজারের বেশি মানুষ। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৫ শতাংশ কম। গত দুই অর্থবছর ধরেই বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অভিবাসন খাতের বিশ্লেষকদের মতে, চলতি অর্থবছরের শুরুতেও পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিও ধীর হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এবং অর্থনীতিকে বহিরাগত চাপ থেকে রক্ষা করতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই বিদেশে কর্মসংস্থানের গতি কমে গেলে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেই পড়তে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ওই অঞ্চলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রবাহে স্পষ্ট ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে ৮৬ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গেছেন। এর মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কর্মীই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ পেয়েছেন। ২০২৪ অর্থবছরে প্রায় ১২ লাখ মানুষ বিদেশে কাজের সুযোগ পান, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত চার দশক ধরে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। একই সঙ্গে এসব দেশ থেকেই দেশের বড় অংশের প্রবাসী আয় আসে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ কমেছে, অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের গতি শ্লথ হয়েছে এবং নতুন শ্রমিক নিয়োগও আগের তুলনায় কমে গেছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা নতুন প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে প্রথম ধাক্কা আসে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর। ইতোমধ্যে অনেক কর্মী দেশে ফিরতে শুরু করেছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যদি আঞ্চলিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য তৈরি হয়নি। ফলে কোনো একটি অঞ্চলে সংকট দেখা দিলেই পুরো বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে।
তবে নতুন কিছু সম্ভাবনার কথাও সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কয়েক লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই নতুন করে কর্মী নিয়োগ শুরু হতে পারে।
এ ছাড়া পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন পেতে পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে নতুন বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ আরও সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন বাজার খুঁজে পেলেই হবে না; আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ আরও উচ্চ আয়ের শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে উন্নত দক্ষতার কর্মীরা বেশি আয় করতে পারবেন, যা ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে। যদিও জুলাই মাসে প্রবাসী আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে, তবুও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো মোট প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ নতুন নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ, ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী তৈরি করার বিকল্প নেই। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখা সম্ভব হবে।

