পশ্চিমা দেশগুলোর বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়া এবং দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকটের কারণে বড়দিনের মৌসুমে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গতি কমে গেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই গুরুত্বপূর্ণ বাজারেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমতে থাকায় এবারের বড়দিনের পোশাকের চালানও গত বছরের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় এক রপ্তানিকারকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বড়দিন উপলক্ষে পোশাকের চালান গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড়দিনের মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি পণ্য বিদেশি বাজারে পাঠানো হয়। ফলে এই সময়ে রপ্তানি আদেশ ও উৎপাদনে যে কোনো ধরনের ধীরগতি পুরো পোশাক খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, পশ্চিমা বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের পোশাক কেনার সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত জ্বালানি সংকটও বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের হাতে আগের মজুত পোশাক বেশি থাকায় নতুন করে পণ্য কেনার আগ্রহও কমেছে।
দেশের ভেতরের জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কক্সবাজারে ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে গাজীপুরের পোশাকশিল্প এলাকায় অনেক কারখানা গত সপ্তাহে শ্রমিকদের চার দিনের ছুটি দিতে বাধ্য হয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, সোমবারের দিকে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
ইভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরেই গ্যাসের নিম্নচাপ ও জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাকশিল্প সমস্যার মধ্যে রয়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার প্রতিষ্ঠানের বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে লেভিস, আরমানি, জারা, এইচঅ্যান্ডএম ও সিঅ্যান্ডএ অন্যতম।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি পারভেজ আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক ক্রেতা কাজের আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক ছিলেন। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রপ্তানির পরিসংখ্যানেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত উভয় বাজারেই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৮৯ শতাংশ কমে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩.৩১ শতাংশ কমে ১৯.০৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও একই ধরনের চাপ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৫.৭৫ শতাংশ কমে ৪.০১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু জুন মাসের হিসাব কিছুটা আশাব্যঞ্জক। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের জুনের তুলনায় ৫.৭৪ শতাংশ বেড়ে ৭৬৩.৫৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এনভয় লিগ্যাসি ও শেলটেক গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, পশ্চিমা বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব বিশ্বের সব বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশের ওপরই পড়ছে। ফলে এবারের বড়দিনের মৌসুমে বাংলাদেশের পোশাকের চালানও কিছুটা কম থাকবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে অনন্ত গ্রুপের চেয়ারম্যান শরীফ জহির জানিয়েছেন, বোনা পোশাকের চালান এ মৌসুমে মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নিট পোশাকের চাহিদা কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এলিট গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামজুল সেরাজ জানান, ক্রেতারা কাজের আদেশ দিতে দেরি করায় চলতি মৌসুমে তাদের রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ কমেছে।
তবে পুরো অর্থবছরের চিত্র নিয়ে কিছুটা আশাবাদী পোশাক খাতের নেতারা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ পোশাক রপ্তানি গত বছরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বা সামান্য ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার আশা, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হলে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে। সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং প্রণোদনা প্যাকেজও ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে ইউরোপের এক বড় ক্রেতা সম্প্রতি বাংলাদেশকে সাধারণ মানের পোশাকের পাশাপাশি বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। ওই ক্রেতার মতে, বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচটি পোশাকপণ্য—টি-শার্ট, ট্রাউজার, আনুষ্ঠানিক শার্ট, সোয়েটার ও অন্তর্বাস—মোট পোশাক রপ্তানির ৭৮ শতাংশ দখল করে আছে। ফলে কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ধরনের পোশাক উৎপাদনে যেতে হবে।
প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের পর বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানের মতো বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলো একই ধরনের পণ্য একই বাজারে পাঠাচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে ড্রাগন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা কিউ সোবহান রুবেল জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ উত্তর আমেরিকার বাজারে তাদের পোশাকের চালান মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ইউরোপের বাজারে চলতি মৌসুমে রপ্তানি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বড়দিনের মৌসুমে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দুর্বল চাহিদা, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি সংকট—দুই দিকের চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ মোকাবিলায় উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রচলিত পণ্যের বাইরে বেশি মূল্য সংযোজিত ও বৈচিত্র্যময় পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোই এখন বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

