বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন একটি সময় পার করছে, যখন বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকোচন এবং দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় সরকারের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—রাজস্বের সীমাবদ্ধতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, নাকি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে সুরক্ষিত রাখা হবে?
অর্থনীতির দুর্বল অবস্থার প্রভাব সমাজের সব মানুষের ওপর পড়লেও দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর এর চাপ সবচেয়ে বেশি। কারণ আয় কমে গেলে বা কাজ হারালে উচ্চ আয়ের মানুষের তুলনায় দরিদ্র পরিবারের বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অনেক কম থাকে। খাবার, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা বাসস্থানের মতো মৌলিক ব্যয়ও তখন সংকুচিত করতে হয়। ফলে অর্থনৈতিক সংকট খুব দ্রুত সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
২০২৪ সালের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপেও উদ্বেগের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। কৃষি, উৎপাদন এবং সেবা—অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাতেই কর্মসংস্থান কমেছে। অর্থাৎ শুধু একটি নির্দিষ্ট খাত নয়, সামগ্রিক কর্মবাজারেই চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২২ সালের পর থেকে মধ্যম ও চরম দারিদ্র্যের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেখায়, সরকারি সহায়তা ও মানব উন্নয়ন ব্যয়ের গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপ। কয়েক বছর ধরে কম বরাদ্দ এবং সীমিত সরকারি ব্যয়ের পর এই তিনটি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে বাজেট ঘোষণায় অর্থ রাখা আর বাস্তবে সেই অর্থ মানুষের কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা হলো, ঘোষিত বরাদ্দের পুরোটা শেষ পর্যন্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
অতীতের বাজেটগুলোতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, বাস্তব ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই তার তুলনায় কম ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারা। রাজস্ব কম এলে সরকারকে ব্যয় সংকোচন করতে হয় এবং প্রায়ই উন্নয়ন ও সামাজিক খাতের ব্যয় এর প্রভাব বহন করে।
তবে সমস্যাটি শুধু অর্থের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যয়ের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বরাদ্দকৃত অর্থ যদি সময়মতো ব্যবহার না হয়, প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে না পৌঁছায় কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে বরাদ্দ বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সামাজিক ফল পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ২০২৭ অর্থবছরে সরকারের সামনে তিনটি বড় পরীক্ষা থাকবে—রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, মানব উন্নয়নের বরাদ্দ রক্ষা করা এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।
এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার পুরো বরাদ্দ ব্যয় করা সম্ভব হলেও মানব উন্নয়নে মোট ব্যয় হবে মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র ৩.৪৩%। ২০২৬ অর্থবছরের ২.৪৯% ব্যয়ের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। কিন্তু আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনও বেশ পিছিয়ে।
ভিয়েতনামে মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ১১.৪%, থাইল্যান্ডে ৯.১%, মালয়েশিয়ায় ৮.৬% এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৫.৫%। এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ৩.৪৩% এখনও অনেক কম। অর্থাৎ এবারের বৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও এটিকে পর্যাপ্ত বলা যাবে না। বরং এটি দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত।
এ কারণেই বাজেটে ঘোষিত মানব উন্নয়ন ব্যয় যেন বছরের মাঝামাঝি এসে রাজস্ব ঘাটতির কারণে কমিয়ে দেওয়া না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থনীতির দুর্বল সময়ে মানুষের ওপর সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ দিলে তার সামাজিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে। তাই ব্যয় সংকোচনের প্রয়োজন দেখা দিলে কোন খাতে কাটছাঁট হবে, তা আগে থেকেই কৌশলগতভাবে ঠিক করা প্রয়োজন।
রাজস্বের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হতে পারে কর রাজস্বের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা। ২০২৬ অর্থবছরে সংগৃহীত কর রাজস্ব ছিল ৪.১ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৬.৭%। নতুন বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৬.৩ ট্রিলিয়ন টাকা বা মোট দেশজ উৎপাদনের ৭.৮% করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে কর রাজস্ব ৫৪% বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এমন একটি সময়ে এই লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যখন অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ধীরগতির মধ্যে রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৭% হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে এবং আমদানিও সীমিত হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি খুব দ্রুত সম্প্রসারিত না হয়, তাহলে প্রচলিত পদ্ধতিতে কর রাজস্ব ৫৪% বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। ফলে শুধু করের হার বাড়িয়ে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করলে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সাধারণ করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি কমানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
সরকার ইতিমধ্যে কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা কমিয়ে করের ভিত্তি বিস্তারের কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে কার্যকর কর সংস্কারের জন্য শুধু নতুন নিয়ম করলেই হবে না। কর প্রদানের পদ্ধতিকে সহজ, স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
মানুষ স্বেচ্ছায় কর দিতে আগ্রহী হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব ভিত্তি শক্তিশালী হয়। কিন্তু করদাতা যদি মনে করেন, কর নথি জমা দেওয়া মানেই জটিলতা, হয়রানি কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ঝুঁকি, তাহলে স্বেচ্ছায় কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন সংকেতের বাধ্যবাধকতার কারণে এই প্রক্রিয়া প্রয়োজনের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। বিদেশে অবস্থানরত কোনো করদাতা বা তাঁর অনুমোদিত প্রতিনিধি বাংলাদেশি মুঠোফোন নম্বর ছাড়া কর নথি জমা দিতে সমস্যায় পড়তে পারেন। এ ধরনের বাধা করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
যে কোনো বৈধ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী ব্যক্তি অথবা অনুমোদিত প্রতিনিধি যেন বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে সহজে কর নথি জমা দিতে পারেন, এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি যারা কাগজে নথি জমা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাদের জন্যও সেই সুযোগ রাখা যেতে পারে।
আয়, ব্যয় এবং সম্পদের জটিল সমন্বয় বিবরণও অনেক করদাতার জন্য বাড়তি চাপের কারণ হতে পারে। এ ধরনের বিধান যদি অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা তৈরি করে, তাহলে তা হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। তাই কর যাচাইয়ের নিয়ম এমন হতে হবে, যাতে প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত হয় কিন্তু সৎ করদাতা অযথা সমস্যায় না পড়েন।
কর নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োজন। নির্বিচারে নিরীক্ষা চালানোর পরিবর্তে ঝুঁকি, তথ্য এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে অল্পসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নির্বাচন করা উচিত। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, করদাতার আস্থা বাড়বে এবং প্রকৃত কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও জরুরি
রাজস্ব বৃদ্ধির আলোচনা শুধু করের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থাও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। সুশাসন, মূল্য নির্ধারণের সংস্কার এবং বাণিজ্যিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশকে লাভজনক বা অন্তত স্বনির্ভর করা সম্ভব হতে পারে।
রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্পদ থেকে যুক্তিসঙ্গত আয় পাওয়া গেলে সরকারের অকর রাজস্ব বাড়বে। একই সঙ্গে লোকসান পূরণে বাজেট থেকে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার প্রয়োজনও কমবে। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কারকে মানব উন্নয়ন ব্যয় সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একটি ক্ষেত্রের সাশ্রয় অন্য একটি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তারপরও বাস্তবতা হলো, কর এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান—উভয় ক্ষেত্রেই সংস্কার করলেও ২০২৭ অর্থবছরের অত্যন্ত উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত নাও হতে পারে। অর্থনীতির বর্তমান ধীরগতির কারণে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই এখন থেকেই একটি বিকল্প ব্যয় পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে কোন খাত সুরক্ষিত থাকবে এবং কোন খাতের ব্যয় কমবে, সেটি আগেই নির্ধারণ করা উচিত। এই বিকল্প পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা।
কোথায় ব্যয় কমানো সম্ভব
সরকারি বাজেটের বড় একটি অংশ খুব সহজে কমানো সম্ভব নয়। বেতন, পেনশন, প্রশাসনিক পরিচালন ব্যয়, সরকারি ঋণের সুদ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের মতো খাতগুলো তুলনামূলকভাবে স্থির প্রকৃতির।
এসব খাত মিলিয়ে মোট বাজেটের প্রায় ৫০% ব্যয় হয়। ফলে রাজস্ব কম এলে বাকি প্রায় ৫০% অংশের ওপর চাপ পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, ভর্তুকি এবং অন্যান্য ব্যয়।
অতীতে রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিই সবচেয়ে বেশি কাটছাঁটের শিকার হয়েছে। কারণ চলতি ব্যয়ের তুলনায় উন্নয়ন প্রকল্প পিছিয়ে দেওয়া প্রশাসনিকভাবে অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু সব উন্নয়ন প্রকল্প একই ধরনের নয়। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষার প্রকল্প নির্বিচারে কমিয়ে দিলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হতে পারে।
তাই শুধু উন্নয়ন ব্যয় কেটে রাজস্ব ঘাটতি সামলানো যথেষ্ট বিচক্ষণ নীতি নয়। বরং কম জরুরি এবং কম কার্যকর ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলোকে আগে শনাক্ত করতে হবে।
মানব উন্নয়নের চেয়ে ভর্তুকিতে বেশি ব্যয় কেন
সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো ভর্তুকির দ্রুত বৃদ্ধি। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে বাজেটের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
২০২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৪২% হয়েছে। একই অর্থবছরে মানব উন্নয়নে ব্যয় ছিল মাত্র ২.৩১%। অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও ভর্তুকিতে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।
এটি সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ, দক্ষ এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। সেই জায়গায় প্রয়োজনীয় অর্থ না দিয়ে বড় অঙ্কের সম্পদ ভর্তুকিতে ব্যয় করলে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে মানব উন্নয়ন ব্যয় কমানোর আগে ভর্তুকির কাঠামো পর্যালোচনা করা উচিত। বিশেষ করে যেসব ভর্তুকির বড় অংশ এমন মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে, যারা বাজারমূল্য দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, সেসব ক্ষেত্রে সংস্কারের সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি পণ্যের মূল্য বাস্তবসম্মত করা, জ্বালানি সরবরাহে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
একইভাবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়কে কেন্দ্র করে দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। মুদ্রার বিনিময় হার যদি সত্যিকার অর্থে বাজারভিত্তিক ও নমনীয় হয়, তাহলে আলাদা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন কতটা রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা উচিত।
রাষ্ট্রায়ত্ত অজ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমানো গেলেও ভর্তুকির একটি অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। অর্থাৎ ভর্তুকি সংস্কার শুধু ব্যয় কমানোর বিষয় নয়; এটি সরকারি সম্পদকে বেশি কার্যকর খাতে স্থানান্তরের একটি সুযোগ।
উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত হতে হবে
২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে প্রকৃত ব্যয় ছিল প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন টাকা। ২০২৭ অর্থবছরে এটি বাড়িয়ে ৩ ট্রিলিয়ন টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় এক বছরের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় যে অত্যন্ত কম ছিল, তা বিবেচনায় নিলে নতুন অর্থবছরে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই অর্থ খরচ করা সম্ভব হয় না।
প্রকল্প প্রস্তুতি, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ, অনুমোদন, প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসবের ওপর বাস্তবায়নের সক্ষমতা নির্ভর করে। তাই অর্থের ঘাটতি না থাকলেও এক বছরে ১.৪ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে ৩ ট্রিলিয়ন টাকায় উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে যাওয়া বাস্তবায়নের দিক থেকে কঠিন হতে পারে।
এ কারণে উন্নয়ন কর্মসূচিতে সংখ্যাগত বড় লক্ষ্য দেখানোর পরিবর্তে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প নির্বাচন করা বেশি জরুরি। যেসব প্রকল্প দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল দেবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নত করবে, সেগুলোকে প্রথম সারিতে রাখতে হবে।
অপ্রয়োজনীয়, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পে অর্থ আটকে রেখে মানব উন্নয়নে ব্যয় কমানো অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিসঙ্গত হবে না।
সংকটের সময় মানুষে বিনিয়োগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো রাজস্ব কমলে সহজ পথে ব্যয় কমানো। অন্যটি হলো ব্যয়ের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করে মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় খাতগুলো সুরক্ষিত রাখা।
প্রথম পথটি প্রশাসনিকভাবে সহজ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য অনেক বেশি। স্বাস্থ্যসেবায় অর্থ কমলে দরিদ্র পরিবার ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে পড়ে। শিক্ষায় ব্যয় কমলে শিক্ষার মান, অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামাজিক সুরক্ষা দুর্বল হলে মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকটের ধাক্কা সরাসরি দরিদ্র মানুষের জীবনে আঘাত করে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির বিনিয়োগও। দক্ষ ও সুস্থ মানুষ ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।
এই কারণেই ২০২৭ অর্থবছরের মানব উন্নয়ন বরাদ্দকে শুধু বাজেটের তিনটি খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা
বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে এর মূল্য নির্ভর করবে কত টাকা ঘোষণা করা হয়েছে তার ওপর নয়, বরং কত টাকা যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে এবং সেই ব্যয় মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এনেছে তার ওপর।
স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও যদি চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সেবা না পৌঁছায়, শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়লেও যদি শিক্ষার মান উন্নত না হয়, কিংবা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে না যায়, তাহলে বড় বরাদ্দও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
তাই বরাদ্দের পাশাপাশি বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ, জবাবদিহি এবং ফলাফল মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কোন কর্মসূচিতে কত অর্থ খরচ হলো—এই হিসাবের পাশাপাশি সেই অর্থে কত মানুষ বাস্তব সুবিধা পেল, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।
রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কর প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে হবে, তবে করদাতাকে ভয় দেখিয়ে নয়; নিয়ম সহজ করে, স্বচ্ছতা বাড়িয়ে এবং স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার করতে হবে, তবে শুধু দাম বাড়িয়ে নয়; পরিচালনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমে, কিন্তু দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ নতুন চাপের মুখে না পড়ে। অর্থাৎ সংস্কারের উদ্দেশ্য হতে হবে সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি অগ্রাধিকারের
বাংলাদেশের বাজেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অর্থের ঘাটতি নয়। সীমিত অর্থ কোথায় ব্যয় করা হবে, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৪২% ভর্তুকিতে ব্যয় হয়েছে, অথচ মানব উন্নয়নে ব্যয় ছিল ২.৩১%। ২০২৬ অর্থবছরে মানব উন্নয়ন ব্যয় ছিল ২.৪৯%। ২০২৭ অর্থবছরে পূর্ণ বরাদ্দ বাস্তবায়িত হলে এটি ৩.৪৩%-এ উঠতে পারে। এই অগ্রগতি ধরে রাখা জরুরি।
তবে সামনে কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। কর রাজস্ব ৪.১ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে ৬.৩ ট্রিলিয়ন টাকায় নেওয়ার লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। অর্থনীতি মাত্র ৩.৭% হারে বাড়ার পূর্বাভাসের মধ্যে ৫৪% কর রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা সহজ হবে না।
রাজস্ব ঘাটতি হলে তাই আবারও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ কমানোর পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া উচিত হবে না। বরং ভর্তুকি সংস্কার, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানো এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জায়গা তৈরি করতে হবে।
অর্থনৈতিক সংকটের সময় সবচেয়ে দুর্বল মানুষের ওপর ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সহজ সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেটি টেকসই সিদ্ধান্ত নয়। একটি দেশের বাজেটের প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় তখনই, যখন অর্থের সংকটে সে ঠিক করে কাকে আগে সুরক্ষা দেবে।
বাংলাদেশের জন্য সেই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মানুষ। স্বাস্থ্যবান মানুষ, শিক্ষিত মানুষ, কর্মক্ষম মানুষ এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম মানুষই দীর্ঘমেয়াদে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
তাই ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে মানব উন্নয়নের যে বাড়তি গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে, সেটিকে কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজস্ব ঘাটতি এলেও এই বরাদ্দ রক্ষা করতে হবে, অর্থের অপচয় কমাতে হবে এবং প্রতিটি ব্যয়ের ফল মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।
হিসাবের সুবিধার জন্য মানব উন্নয়নকে পিছিয়ে দেওয়ার সময় আর নেই। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন এমন একটি বাজেট দর্শন, যেখানে ব্যয় কমানোর সহজ পথের চেয়ে মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় প্রকল্প, রাজস্বের অঙ্ক কিংবা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার হয় না; মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, সুস্থ এবং সম্ভাবনাময় হয়েছে—সেটিই উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

