দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে ঋণের মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এ খাতে মোট ঋণের পরিমাণ কমার পাশাপাশি শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মার্চ শেষে এ খাতের মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ২৪ দশমিক ০৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন টাকা। আগের প্রান্তিকে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এ পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ঋণের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়ও এ ঋণ কমেছে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
একদিকে মোট ঋণের পরিমাণ কমেছে, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মোট ঋণের তুলনায় শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত দ্রুত বেড়ে গেছে। ব্যাংকারদের মতে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর ঝুঁকি যাচাই, নতুন ঋণ বিতরণে ধীরগতি এবং প্রান্তিক পর্যায়ে বকেয়া আদায়ে বাড়তি তৎপরতার কারণে এ সময়ে মোট ঋণের প্রবাহ কমেছে।
কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতের মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৫২ শতাংশই রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে। এ খাতে সবচেয়ে বড় অংশের ঋণ রয়েছে তাদের। ইসলামী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। বাকি ঋণের মধ্যে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকের ৩ দশমিক ১২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকের ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
ব্যাংকারদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে মোট ঋণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা কমে গেলেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেনি। বরং পরিমাণের দিক থেকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো এখনো উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের উচ্চমূল্য এবং নগদ অর্থের সংকটের মতো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আয় ও নগদ প্রবাহে চাপ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা চাপ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে আদায়ের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই সময়ে আদায়যোগ্য ১ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬৫২ দশমিক ৯১ বিলিয়ন টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এই হার কম হলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ উন্নয়নবিষয়ক মাস্টার সার্কুলার নম্বর ০১/২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাংক ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট বকেয়া ঋণের অন্তত ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে দেওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের আকার, নারী উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন খাতের ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের উপ-লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি পিছিয়ে যায়নি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫৩টি প্রতিষ্ঠানকে কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন হিসেবে মোট ৫২১ দশমিক ০৮ বিলিয়ন টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে এ খাতে বিতরণ হয়েছিল ৪৭৮ দশমিক ১৩ বিলিয়ন টাকা। একই সময়ে অর্থায়ন পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। আগের বছরের ৩ লাখ ২৩ হাজার ৭৩৪টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে এবার অর্থায়ন পেয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫৩টি প্রতিষ্ঠান।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জরুরি হলেও হঠাৎ করে ঋণের প্রবাহ কমে গেলে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আরও দুর্বল হতে পারে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের বড় অংশই এই ধরনের ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ খাতে ঋণপ্রবাহে অতিরিক্ত সংকোচন সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতের ওপর তৈরি হওয়া চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, দুর্বল চাহিদা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়া কমিয়ে না দিয়ে বরং ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা প্রয়োজন। ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্তে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হলেও তাদের হাতে থাকা তথ্য এখনো পর্যাপ্ত পরিণত ও সমন্বিত নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সম্ভাবনা ভালো কিন্তু সাময়িক নগদ অর্থের সংকটে রয়েছে, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পুনর্গঠন বা পরিশোধে নমনীয়তার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ঋণ আদায়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করা দরকার। উদ্যোক্তাদের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানোও জরুরি, কারণ অনেক ব্যবসায়ী ঋণ ব্যবস্থাপনা ও নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়েন।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব ঋণনীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত বেড়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে অনেক ছোট ব্যবসা এখনো দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। উচ্চ ঋণের ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল চাহিদা এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
তার মতে, ব্যাংকগুলোর অবশ্যই সতর্কভাবে ঋণ দিতে হবে। তবে অতিরিক্ত কঠোরতার কারণে ঋণের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই শুধু কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণ কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ঋণ যাচাইয়ের মান উন্নত করা, সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া এবং ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই বেশি কার্যকর হবে।
সব মিলিয়ে মার্চ ২০২৬-এর তথ্য কুটির, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতের সামনে থাকা দ্বৈত সংকটকে স্পষ্ট করেছে। একদিকে নতুন ঋণ বিতরণ কিছুটা বাড়লেও মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ কমেছে, অন্যদিকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে। ফলে টেকসইভাবে এই খাতকে সচল রাখতে ব্যাংকগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রকৃত সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থের প্রবাহও অব্যাহত রাখা।

