বাংলাদেশের হাজারো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা স্থানীয় বাজারে ভালো ব্যবসা করছেন। চামড়াজাত পণ্য, জুতা, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত খাবার, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে একটি পণ্য সফলভাবে বিক্রি করতে পারা আর আন্তর্জাতিক বাজারে বিদেশি বায়ারের কাছে সেটি বিক্রি করা এক বিষয় নয়। রপ্তানির জন্য ভালো পণ্য তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন, মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য লজিস্টিকস, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—সবকিছুর প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের এসএমই খাতের বড় দুর্বলতা ঠিক এই জায়গাতেই। অর্থাৎ অনেক উদ্যোক্তার সমস্যা পণ্য তৈরি করতে না পারা নয়; বরং সেই পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তোলা এবং সঠিক ক্রেতার কাছে পৌঁছানো।
এসএমইদের বিদেশে যেতে না পারার ক্ষেত্রে অর্থের সংকট অবশ্যই বড় বাধা, কিন্তু এটিই একমাত্র সমস্যা নয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও তৈরি পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মান ও পরিবেশগত শর্ত পূরণের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। বিদেশি বায়াররা এখন শুধু পণ্যের দাম দেখেন না; পণ্যের মান, উৎপাদন প্রক্রিয়া, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, পরিবেশের ওপর প্রভাব, প্যাকেজিং এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাও বিবেচনা করেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব শর্ত পূরণের প্রমাণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সার্টিফিকেশন প্রয়োজন হয়। বড় কোম্পানির পক্ষে এই অতিরিক্ত খরচ ও প্রক্রিয়া সামলানো সম্ভব হলেও ছোট উদ্যোক্তার জন্য তা কঠিন। দেশের কোনো কোনো ল্যাবরেটরির পরীক্ষার প্রতিবেদন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় একই পণ্য বিদেশে গিয়ে আবার পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। ফলে স্থানীয় বাজারে জনপ্রিয় একটি পণ্য বিদেশি বায়ারের কাছে পৌঁছানোর আগেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যেতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতি। স্থানীয় ক্রেতার জন্য তৈরি একটি পণ্যের ক্ষেত্রে যে মান যথেষ্ট, ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার কোনো বায়ারের কাছে সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। পণ্যের উপাদান, আকার, প্যাকেজিং, লেবেলিং, উৎপাদন পদ্ধতি কিংবা মান নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট শর্ত থাকতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য উদ্যোক্তাকে জানতে হয় কোন দেশে তার পণ্যের চাহিদা আছে, সেখানে সম্ভাব্য বায়ার কারা, তারা কত দামে কিনছেন এবং কী ধরনের শর্ত দিচ্ছেন। একজন বড় রপ্তানিকারকের আলাদা বাজার গবেষণা, বিক্রয় ও মান নিয়ন্ত্রণ দল থাকতে পারে; কিন্তু একজন ছোট উদ্যোক্তাকে একই সঙ্গে উৎপাদন, হিসাব, ব্যাংকিং, বিক্রয় ও রপ্তানির কাজ সামলাতে হয়। ফলে পণ্য তৈরি করতে পারলেও সঠিক বায়ারের কাছে পৌঁছানো তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের একটি সহায়তা কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সহায়তা পেলে এসএমইদের নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ সম্ভাবনার অভাব নেই; মূল সমস্যা হলো অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি ‘এক্সপোর্ট রেডি’ হয়ে উঠতে পারেনি।
রপ্তানির ক্ষেত্রে লজিস্টিকস ও অর্থায়নের সমস্যাও ছোট ব্যবসার জন্য বড় হয়ে ওঠে। বিদেশি বায়ার অর্ডার দেওয়ার পর উদ্যোক্তাকে আগে কাঁচামাল কিনতে হয়, শ্রমিকের মজুরি দিতে হয়, পণ্য তৈরি ও প্যাকেজিং করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত পণ্য বন্দরে পাঠানোর খরচও বহন করতে হয়। অথচ অর্থ হাতে আসতে পারে আরও পরে। এই ব্যবধান সামলাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দরকার, কিন্তু ছোট ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ পাওয়া সবসময় সহজ নয়। অন্যদিকে পণ্য কারখানা থেকে বন্দর, কাস্টমস ও জাহাজ হয়ে বিদেশি বায়ারের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সময় ও খরচ যুক্ত হয়। বড় রপ্তানিকারকরা বড় চালানে এই খরচ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারলেও এসএমইদের ছোট চালানে প্রতি ইউনিট পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেশি পড়ে। ফলে ভালো পণ্য তৈরি করেও দামের দিক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে এসব বাধা অতিক্রম করে একটি শক্তিশালী বায়ার, সরবরাহকারী, লজিস্টিকস, কমপ্লায়েন্স ও দক্ষ জনবলের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু চামড়া, জুতা, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মতো খাতের অনেক এসএমই এখনো এমন পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ আরও কঠিন হতে পারে। তখন শুধু কম দামে পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট হবে না; পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, ডিজাইন, পরিবেশগত মান এবং সরবরাহের গতি—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব বাড়বে। তাই এসএমইদের বিদেশে নেওয়ার জন্য শুধু ঋণ বা রপ্তানি প্রণোদনা দিলেই হবে না। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন সুবিধা বাড়াতে হবে, সম্ভাবনাময় বাজার ও বায়ারের তথ্য সহজে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি অর্ডার পাওয়ার পর পণ্য তৈরি ও সরবরাহের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বাংলাদেশের এসএমইদের অনেকেই পণ্য তৈরি করতে পারেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পুরো ব্যবস্থাটি এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই দেশের এসএমই রপ্তানি বাড়ানোর আসল চ্যালেঞ্জ শুধু ‘আরও বেশি উৎপাদন’ নয়; বরং এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন ছোট উদ্যোক্তা ভালো পণ্য তৈরি করে সেটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে, বিদেশি বায়ার খুঁজে পেতে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে সেই পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে পারেন।

