অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মধ্যেও গত অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সামান্য বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধি খুবই সীমিত হওয়ায় অর্থনীতিবিদেরা এটিকে বড় কোনো সাফল্য হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তাঁদের মতে, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন না এলে ভবিষ্যতে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাথমিক রাজস্ব সংগ্রহের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে অনুপাত বেড়েছে মাত্র ০ দশমিক ০৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তবে এর আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্রটি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে অনুপাত এখনো আগের অবস্থানে ফিরতে পারেনি।
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এই হিসাব করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রাথমিক কর সংগ্রহের তথ্যের ভিত্তিতে। পরবর্তী সময়ে করবহির্ভূত রাজস্ব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাইরে অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে সংগৃহীত রাজস্বের তথ্য যুক্ত হলে অনুপাতের হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে। ফলে জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে এই সংস্থার কার্যক্রমের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্য পূরণেও ঘাটতি রয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবেও ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবারই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় করে নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সেই লক্ষ্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, বাস্তবসম্মত নয় এমন লক্ষ্য নির্ধারণের ফলে মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ না হলে তাঁদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হয়।
রাজস্ব সংগ্রহের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতি যত সক্রিয় থাকে, বিনিয়োগ ও ব্যবসা যত বাড়ে, মানুষের আয় ও ভোগব্যয় যত বাড়ে, তত বেশি কর সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু গত অর্থবছরে অর্থনীতির সেই গতি ছিল দুর্বল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, রাজস্ব সংগ্রহের বড় অংশই নির্ভর করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। বিশেষ করে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু গত অর্থবছরে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে যত অর্থ বরাদ্দ ছিল, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে যে উৎসে কর আদায় হয়, তার একটি বড় অংশ রাজস্ব সংগ্রহে যুক্ত হয়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় ধীর হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায়েও তার প্রভাব পড়ে।
ওই কর্মকর্তা মনে করেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক গতিতে না ফিরলে রাজস্ব সংগ্রহও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ানো কঠিন হবে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, সেই তুলনায় সরকার কতটা অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছে, এই অনুপাত তার একটি ধারণা দেয়।
বাংলাদেশে গত অর্থবছরে অনুপাত কিছুটা বাড়লেও অর্থনীতিবিদদের মতে, ০ দশমিক ০৮ শতাংশীয় পয়েন্টের এই বৃদ্ধি খুবই সামান্য। বিশেষ করে যখন দেশের উন্নয়ন ও সরকারি ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে আসছে, তখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
নীতি সংলাপ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গত অর্থবছরে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে অস্থিরতারও প্রভাব ছিল।
তাঁর মতে, রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনো প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনেকটা প্রচলিত পদ্ধতিতেই কাজ করছে। এই অবস্থায় ভবিষ্যতেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
তাঁর পরামর্শ, প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে দূর করতে হবে। এক বছরের মধ্যে পুরো রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সম্ভব নয়—কিন্তু সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করতে আর দেরি করার সুযোগ নেই।
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব সংগ্রহ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। সার্বিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ শতাংশ।
তবে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে এই প্রবৃদ্ধি নিয়েও খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।
গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে মূল্য সংযোজন কর থেকে। এই খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আয়কর থেকে এসেছে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর শুল্ক ও আমদানি কর থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, রাজস্বের বড় অংশ এখনো ভোগ, আয় এবং আমদানি-নির্ভর কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিনিয়োগ, ব্যবসা ও ভোগব্যয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা তৈরি হলে রাজস্ব সংগ্রহেও তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।
গত অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও আশানুরূপ ছিল না। ঋণের চাহিদা কম থাকা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সতর্ক মনোভাব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
এর ফলে একদিকে নতুন বিনিয়োগ কমেছে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক লেনদেন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রত্যাশিত গতি আসেনি। কর আদায়ের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়া তাই অস্বাভাবিক নয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য শুধু করের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বরং করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনকে দক্ষ করা, কর ফাঁকি বন্ধ করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় সরকারের হাতে উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতে ব্যয় করার নিজস্ব সম্পদ সীমিত। তাই যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে ব্যয় কমিয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতে সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান মনে করেন, অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও আগের বছরের তুলনায় বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। তাঁর মতে, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর কর্মকর্তারা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশে ওঠা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক খবর হলেও এর পেছনের বাস্তবতা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ অনুপাতটি এখনো ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭ দশমিক ২০ শতাংশের তুলনায় নিচে রয়েছে। একই সময়ে রাজস্বের প্রয়োজন বাড়ছে, কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বৈদেশিক অর্থায়ন—দুই ক্ষেত্রেই নানা চাপ তৈরি হয়েছে।
তাই সামান্য এই উন্নতিকে সাফল্যের শেষ ধাপ হিসেবে না দেখে রাজস্ব ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কর আদায়ের পুরোনো পদ্ধতি ধরে রেখে শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সংস্কারই হতে পারে বাংলাদেশের রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।

