মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় বাংলাদেশও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বলে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশ (আইসিসিবি)। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত জ্বালানি, খাদ্য, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি, শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে।
আইসিসিবির ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের নিউজ বুলেটিনে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বৈশ্বিক শান্তি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্য সরবরাহের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকির মধ্যে পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় সেখানে সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে জ্বালানি আমদানিতে। দেশের অর্থনীতি শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল, গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি আমদানি ব্যয়ে পড়বে। শুধু পণ্যের দাম নয়, সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে পরিবহন ও বীমা ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও বাংলাদেশের আগের তুলনায় বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতে পারে।
এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের ভোক্তা ও ব্যবসা—দুই পক্ষের ওপরই পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর পরিবহন ব্যয় বাড়লে কাঁচামাল থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বেড়ে যায়। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও তখন বাড়ে। ব্যবসায়ীরা যদি সেই অতিরিক্ত ব্যয় পুরোপুরি নিজেদের মধ্যে ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইসিসিবি বিশেষভাবে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা উল্লেখ করেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রপ্তানিকারকদের অনেক সময় বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা পণ্যের দামে যোগ করার সুযোগ থাকে না। ফলে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লেও ক্রেতাদের কাছ থেকে একই হারে বেশি দাম আদায় করা সম্ভব নাও হতে পারে। এতে ব্যবসার মুনাফা কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যেতে পারে।
শুধু শিল্প নয়, কৃষিখাতেও এই সংঘাতের পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ সারসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের একটি অংশ আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সার উৎপাদন ও পরিবহন—দুই ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে সারের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে দেশের কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর প্রভাব কৃষিপণ্যের বাজারদরেও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজার থেকে ধীরে ধীরে খাদ্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে আইসিসিবি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়তে পারে। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বাজেট ঘাটতি ও ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সতর্কতা রয়েছে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বিনিয়োগ। কোনো দেশের অর্থনীতিতে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে। নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইসিসিবির মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়ায় এই ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়তি প্রতিযোগিতা মোকাবিলার পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে যদি জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকে, তাহলে দেশের রপ্তানি খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সংঘাতের মানবিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে আইসিসিবি। সংস্থাটির বুলেটিনে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই বিপুল অর্থ মানবিক উন্নয়ন ও জীবন রক্ষার মতো খাতে ব্যয় করার সুযোগ কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার আর্থিক ক্ষতির একটি চিত্রও তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) ও অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের যৌথ বিশ্লেষণ। তাদের হিসাবে, ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার কারণে ১০টি বড় অর্থনীতিতে প্রকৃত ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ২০২ বিলিয়ন ডলার। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ২০২৬ সালে এই ক্ষতি ৩৮০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে নীতিগত স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা ফিরে এলে অতিরিক্ত ২৫২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে আইসিসিবির সতর্কবার্তার মূল বিষয় হলো—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি থেকে পরিবহন, পরিবহন থেকে উৎপাদন, উৎপাদন থেকে পণ্যের দাম—এই পুরো চক্রের মাধ্যমে এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পৌঁছাতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, শিপিং ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং রপ্তানি খাতের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তত বাড়তে পারে; আর সেই অনিশ্চয়তার প্রভাব সামাল দেওয়ার সক্ষমতাই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

