দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান তৈরি করেছে। আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত এক লাফে প্রায় ৪৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে গত পাঁচ অর্থবছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় দাঁড়িয়েছে ৬,৮০১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ৫,৩৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ১,৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা ২৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
শুধু আয় বাড়াই নয়, একই সময়ে রাজস্ব ব্যয়ও সামান্য কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব ব্যয় ছিল ২,৩৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ২,৩৭২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় কমেছে ১৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা বা ০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে বন্দরের কর-পূর্ব রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪,৪২৯ কোটি ১ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই উদ্বৃত্ত ছিল ২,৯৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে উদ্বৃত্ত বেড়েছে ১,৪৫১ কোটি ৮ লাখ টাকা বা ৪৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
পাঁচ বছরে বদলে গেছে আর্থিক চিত্র
চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরে আয় বৃদ্ধির ধারাটি বেশ ধারাবাহিক ছিল। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে সেই প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৪,০৭২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ওই বছর রাজস্ব ব্যয় হয় ১,৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ফলে কর-পূর্ব রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল ২,১০৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৪৩৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ব্যয় হয় ২,১৩৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এতে উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২,৩০৪ কোটি ১২ লাখ টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় আরও বেড়ে হয় ৪,৮৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় ছিল ২,১১৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ফলে ওই বছর রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২,৭১৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়ে ৫,৩৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে ব্যয় হয় ২,৩৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এতে কর-পূর্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২,৯৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চিত্র ছিল আগের বছরগুলোর তুলনায় আলাদা। মাত্র এক বছরে রাজস্ব আয় বেড়েছে ১,৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্যয় না বেড়ে বরং ১৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা কমেছে। ফলে উদ্বৃত্তে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
আয় বাড়ার সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুফল
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু আয় বাড়লেই উদ্বৃত্ত এত দ্রুত বাড়ে না। আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫,৩৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২,৩৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এক বছর পর আয় বেড়ে ৬,৮০১ কোটি ৪২ লাখ টাকা হলেও ব্যয় বরং কমে ২,৩৭২ কোটি ৪১ লাখ টাকায় নেমেছে।
অর্থাৎ অতিরিক্ত আয় থেকে বড় একটি অংশ সরাসরি উদ্বৃত্তে যুক্ত হয়েছে। এর ফলেই এক বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত ২,৯৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৪,৪২৯ কোটি ১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।
এ ধরনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। বন্দরের কার্যক্রম যত বাড়বে, এর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনও তত বাড়বে। তাই আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সক্ষমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
প্রথম ১১ মাসেই ছিল শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবেও বন্দরের ভালো আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন রয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের হিসাব দেখলেও একই প্রবণতা স্পষ্ট ছিল।
এই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় ৬,০৭৭ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত পৌঁছে প্রায় ৪,২৮৭ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ অর্থবছরের শেষ মাসেও বন্দরের আয় ও উদ্বৃত্তে আরও সংযোজন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পুরো বছরের সাময়িক হিসাবে আয় ৬,৮০১ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং উদ্বৃত্ত ৪,৪২৯ কোটি ১ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এতে বোঝা যায়, প্রবৃদ্ধিটি কোনো একটি মাসের অস্বাভাবিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং পুরো অর্থবছরজুড়েই বন্দরের আর্থিক কার্যক্রমে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল।
পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন
পাঁচ বছরের হিসাব তুলনা করলে চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক সক্ষমতার পরিবর্তন আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
২০২১-২২ অর্থবছরে ২,১০৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৪,৪২৯ কোটি ১ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
একই সময়ে রাজস্ব আয় ৪,০৭২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬,৮০১ কোটি ৪২ লাখ টাকা হয়েছে।
তবে লক্ষ করার বিষয় হলো, আয় বৃদ্ধির তুলনায় শেষ অর্থবছরে উদ্বৃত্তের প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ২৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ বাড়লেও রাজস্ব ব্যয় কমেছে ০ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
এ ধরনের ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত উদ্বৃত্তে বড় ধরনের লাফ দিয়েছে।
বন্দরের জন্য এর অর্থ কী
চট্টগ্রাম বন্দরের আর্থিক ফলাফলকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের কার্যকারিতা সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
বন্দরের আয় বাড়ার অর্থ হতে পারে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে এর রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও দক্ষতা দেখিয়েছে।
তবে এই বাড়তি উদ্বৃত্ত কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উদ্বৃত্ত বাড়ানোই শেষ লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ সুবিধা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক চাপ মোকাবিলার অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।
কারণ দেশের আমদানি-রপ্তানি যত বাড়বে, বন্দরের ওপর চাপও তত বাড়বে। বর্তমান আয় ও উদ্বৃত্তের প্রবৃদ্ধিকে যদি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তাহলে এর সুফল শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষের আর্থিক হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সাময়িক হিসাব, তাই সামনে কিছু পরিবর্তন হতে পারে
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক পরিসংখ্যান এখনো চূড়ান্ত নয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এগুলো সাময়িক হিসাব। চূড়ান্ত নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর কিছু সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
তারপরও বর্তমান তথ্য যে প্রবণতা দেখাচ্ছে, তা বেশ স্পষ্ট। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং একই সঙ্গে উদ্বৃত্তও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয় কমে যাওয়ায় আর্থিক ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই বাড়তি আর্থিক সক্ষমতাকে কতটা কার্যকরভাবে ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যায়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে শুধু বেশি আয় করার লক্ষ্য নয়; দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
সাম্প্রতিক ফলাফল সেই অর্থে বন্দরের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এই ভিত্তিকে যদি আধুনিকায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

