ইউরোপের বাজার ধরে রাখতে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতিতে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে সরকার ১৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ইউরোচেম এবং সিপিডি, পিআরআই, র্যাপিডসহ ব্যবসায়ী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। তাদের কাজ হবে আলোচনার কৌশল নির্ধারণ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বাংলাদেশের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর পাওয়া যায় বাণিজ্যের পরিসরে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩.৩ বিলিয়ন ইউরো। বাংলাদেশের মোট বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের ২১.৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এই জোট—অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, যার প্রায় ৯৪ শতাংশই তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ বা ইবিএ ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউরোর রপ্তানি সুবিধা পেয়েছে। ফলে ইউরোপের বাজারে শুল্কসুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যবসার জন্য শুধু একটি অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি দেশের বর্তমান রপ্তানি কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।
তবে সামনে পরিস্থিতি বদলানোর কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ ২৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জিএসপি ব্যবস্থার অধীনে ২০২৬ সালে উত্তরণকারী এলডিসিগুলো অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত ইবিএ সুবিধা পাবে। অর্থাৎ নভেম্বরে সুবিধা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু ২০২৯-এর পর বাংলাদেশের রপ্তানিকে কোন বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এই জায়গায় এফটিএর গুরুত্ব। বর্তমানে ইবিএর সুবিধা মূলত বাংলাদেশের এলডিসি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু একটি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে শুল্কসুবিধা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পারস্পরিক বাণিজ্য কাঠামোর অংশ হতে পারে। এর ফলে শুধু পোশাক নয়, চামড়া ও জুতা, ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশলসহ অন্যান্য খাত ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে একটি স্থিতিশীল বাণিজ্য কাঠামো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। সরকারের নতুন পরামর্শক কমিটিতে বেসরকারি খাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ—আলোচনাটি শুধু সরকারি পর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ না হয়ে ব্যবসার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে এফটিএ মানেই শুধু বাংলাদেশ শুল্কসুবিধা পাবে—এমন নয়। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে দুই পক্ষকেই বাজার উন্মুক্ত করতে হয়। ফলে বাংলাদেশকে ইউরোপের পণ্যের জন্যও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হতে পারে। ইউরোপীয় পণ্য, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও অন্যান্য শিল্পপণ্যের আমদানি বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের বাংলাদেশে রপ্তানির বড় অংশ ছিল যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং রাসায়নিক পণ্য। ফলে এফটিএর প্রভাব শুধু রপ্তানি বাড়বে কি না—এতে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের স্থানীয় শিল্প, আমদানি ব্যয়, প্রতিযোগিতা এবং ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দামের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত পোশাক খাতেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শক্তিশালী হলেও প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ বেড়ে ২১.৫৭ শতাংশ হয়েছে এবং দেশটি দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। ওই বছর বাংলাদেশ প্রায় ১৯.৪১ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক ইউরোপে রপ্তানি করেছে। কিন্তু একই বাজারে চীন, তুরস্ক ও ভারতের মতো বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সক্রিয়।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইইউ-ভারত এফটিএ সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য ইউরোপের বাজারে আরও অনুকূল শুল্কসুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এর অর্থ হলো—শুধু বর্তমান শুল্কসুবিধা ধরে রাখলেই হবে না, উৎপাদন খরচ, পণ্যের মান, সরবরাহের গতি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রম অধিকার—সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সাম্প্রতিক সরকারি আলোচনাতেও ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এফটিএ বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে বিষয়টি সামনে এসেছে।
এফটিএর আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো বিনিয়োগ। একটি বড় বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য শুল্কসুবিধা থাকলে বিদেশি কোম্পানির কাছে বাংলাদেশে উৎপাদন করে ইউরোপে রপ্তানি করার আগ্রহ বাড়তে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মজুত ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ইউরো। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮৬ মিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের তুলনায় বিনিয়োগের সম্পর্ক এখনও অনেক ছোট। সঠিক এফটিএ কাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা গেলে এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু একটি চুক্তি করলেই ব্যবসার সুবিধা নিশ্চিত হবে না। আলোচনায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে শুল্কের পাশাপাশি ‘রুলস অব অরিজিন’, পণ্যের মান, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত শর্ত, মেধাস্বত্ব, সরকারি ক্রয়, সেবা খাত এবং বিরোধ নিষ্পত্তির নিয়ম। বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে ইউরোপের ক্রেতারা এখন শুধু কম দাম দেখছে না; কারখানার নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে বাংলাদেশে শ্রম অধিকার ও শোভন কর্মপরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ পরিচালনা করছে। ফলে ভবিষ্যতের বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের শিল্পকেও এসব মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতির প্রস্তুতির অংশ। এখন বাংলাদেশের সামনে সুযোগ হলো—ইবিএ সুবিধার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আলোচনার টেবিলে শুধু শুল্কমুক্ত রপ্তানি চাওয়া যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশকে এমন একটি চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যা রপ্তানি ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন পণ্য ও নতুন ব্যবসার বাজার খুলবে, বিনিয়োগ আনবে এবং স্থানীয় শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে। ১৭ সদস্যের নতুন পরামর্শক কমিটির সামনে তাই আসল কাজ শুধু এফটিএ স্বাক্ষর করানো নয়—বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের এফটিএ সবচেয়ে লাভজনক হবে, সেটি নিশ্চিত করা।

