অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে বড় ধরনের পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা কার্যকর হওয়ার মাত্র সাত মাসের মধ্যেই বাতিল করেছে সরকার। এর ফলে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে আবারও প্রায় তিন দশক আগের ব্যবস্থায় ফিরে গেছে দেশ। এখন ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেই সময়ের মূল্য নির্ধারণ কাঠামোই আপাতত বহাল থাকবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ রোগীর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে। কারণ, নতুন ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়ানো। সেটি বাতিল হওয়ায় ২০২৬ সালের নতুন তালিকায় যুক্ত হওয়া ওষুধগুলোর ওপর সরকারের সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণ আপাতত থাকছে না। ফলে এসব ওষুধের দাম নির্ধারণে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আগের সুযোগ আবারও ফিরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, নতুন মূল্য নির্ধারণ কাঠামো যথাযথ পরামর্শ ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তৈরি হয়েছিল। তাদের মতে, বাস্তবতা ও শিল্প খাতের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
অর্থাৎ সরকারের সিদ্ধান্তের পেছনে যেমন প্রশাসনিক ও আইনি যুক্তি রয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধশিল্পের সক্ষমতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন।
গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি তৈরির সময় সেই পরামর্শ নেওয়া হয়নি। এই কারণেই নতুন কাঠামো বাতিল করা হয়েছে।
এর ফলে জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চালু হওয়া নতুন ব্যবস্থা কার্যত শেষ হয়ে গেল।
নতুন কাঠামোর মাধ্যমে শুধু অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদই করা হয়নি, বরং সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নতুন তালিকায় মোট ২৯৫টি ওষুধ রাখা হয়। সরকারি ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছিল, আগের তালিকার তুলনায় নতুন করে ১৩৫ থেকে ১৩৬টি ওষুধ যুক্ত হয়েছে।
পরিকল্পনা ছিল, নতুন তালিকাভুক্ত এসব ওষুধ নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হবে।
২০২৬ সালের নতুন ব্যবস্থায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সূত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ওষুধ তৈরির কাঁচামালের দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং প্রচলিত মুনাফার হার বিবেচনায় নেওয়ার কথা ছিল।
নীতিটির মূল লক্ষ্য ছিল জীবনরক্ষাকারী এবং বহুল ব্যবহৃত ওষুধের দাম এমন পর্যায়ে রাখা, যাতে সাধারণ মানুষ তা কিনতে পারে।
কিন্তু পুরো কাঠামো বাস্তবে কার্যকর হওয়ার আগেই বাতিল হয়ে যাওয়ায় বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব কতটা পড়ত, তা যাচাই করার সুযোগই হয়নি।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, পুরো নীতি বাতিল না করে প্রয়োজনীয় জায়গায় সংশোধন করাই যুক্তিযুক্ত ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, যে কারণে সরকার নতুন ব্যবস্থাটি বাতিল করেছে, সেটি পুরো নীতি বাতিল করার মতো বড় কারণ নয়। তার মতে, প্রয়োজন হলে সংশোধনের মাধ্যমে কাঠামোটিকে কার্যকর করা যেত।
তিনি মনে করেন, নতুন তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর দাম নির্ধারিত সূত্রের আওতায় এলে কিছু ওষুধের বর্তমান বাজারদর কমার সম্ভাবনা ছিল। অবশ্য আগের তালিকায় থাকা কিছু ওষুধের দাম বাড়ার সম্ভাবনাও ছিল।
তবে তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ওষুধ কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এর মূল্য নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা অন্তত শক্তিশালী নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। ফলে ওষুধের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপর।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়। কয়েকটি ওষুধের দাম সামান্য বাড়লেও বছরের হিসাবে তা একটি পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন এবং তাদের সারা বছর নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করে। সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৫ শতাংশ।
এই বৈষম্য থেকেই বোঝা যায়, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়; এটি একই সঙ্গে দারিদ্র্য, পারিবারিক ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং এসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আপাতত কার্যকর থাকবে।কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন প্রশ্ন।
২০২৬ সালের তালিকায় যেসব ওষুধ নতুন করে যুক্ত হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলো ১৯৯৪ সালের তালিকায় নেই। ফলে নতুন তালিকা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত এসব ওষুধের মূল্য কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
সরকার অবশ্য জানিয়েছে, নতুন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হবে। ভবিষ্যতে এমন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতাও বজায় থাকে।
তবে নতুন তালিকা কবে হবে, সেখানে কতটি ওষুধ থাকবে কিংবা নতুন মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।ফলে মাঝের এই সময়টিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, নতুন করে তালিকা তৈরির সময় শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, ওষুধ কোম্পানি, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
এতে একদিকে যেমন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় রাখা যাবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় দাম নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে।
তার মতে, সরকার চাইলে একটি নতুন কমিটি বা বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে পারে।
এ ধরনের নিয়মিত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোগের ধরন, চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ওষুধের ব্যবহার সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। প্রায় তিন দশক আগের তালিকাকে দীর্ঘ সময় ধরে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করলে বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজন পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
সরকার যে কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের নতুন তালিকা বাতিল করেছে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।গত ২৯ জুন নতুন করে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। পরিষদে ২২ জন সদস্য রয়েছেন। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি ও হালনাগাদের ক্ষেত্রে সরকারকে পরামর্শ দেওয়াই এর অন্যতম দায়িত্ব।
কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ও পরিষদের সদস্য ড. জাকির আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত পরিষদের কোনো সভা হয়নি। নতুন ওষুধনীতি নিয়েও পরিষদে আলোচনা হয়নি।
পরিষদের আরেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরিদা বেগমও জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের আগে পরিষদের মতামত নেওয়া হয়নি।
এখানেই একটি নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে—যে পরিষদের পরামর্শ না নেওয়াকে নতুন নীতি বাতিলের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেই পরিষদের মতামত ছাড়াই আবার নীতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কেন?
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দুর্বল হলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় আরও বাড়বে।
তার যুক্তি হলো, ওষুধের ক্ষেত্রে চাহিদা বাড়লে সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। মূল্য নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা সরিয়ে দিলে এসব ওষুধও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো বাজারনির্ভর হয়ে পড়তে পারে।
সরকারের সিদ্ধান্তকে অবশ্য স্বাগত জানিয়েছে ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ।
সংগঠনটির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা মূল্য নির্ধারণ কাঠামো তারা শুরু থেকেই মেনে নেয়নি। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত আলোচনা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ওই কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
তবে একই সঙ্গে তিনিও মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা এবং রোগীদের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ শিল্প খাতও পুরোনো তালিকাকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছে না।২০২৬ সালের নতুন কাঠামো নিয়ে এর আগেও আইনি প্রশ্ন উঠেছিল।
গত ২২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছিলেন, নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি তৈরির জন্য গঠিত কার্যদলটির কাঠামোকে কেন্দ্র করেই মূলত আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন, অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
আইন অনুযায়ী গঠিত মূল্য নির্ধারণ কমিটির মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছিল। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নের নির্দেশনাও ছিল।
ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর ৩০ ধারায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের ওপর দেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আইনগত দায়িত্বও জড়িত।
ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের বিশাল ওষুধশিল্প।ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০১টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া দেশে ২৮৫টি ইউনানি, ২০৬টি আয়ুর্বেদিক, ৭১টি হোমিওপ্যাথিক এবং ৩৮টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের ক্ষেত্রে দেশে ১ হাজার ২৬৮ থেকে ৩ হাজার ৫৩৪ ধরনের জেনেরিক ওষুধ নিবন্ধিত রয়েছে বলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সদস্য কোম্পানির সংখ্যা ১৫৭টি।
এই বিশাল শিল্পখাতের উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের দাম, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের বিষয়ও মূল্য নির্ধারণের আলোচনায় বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ একদিকে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি, অন্যদিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টেকসইভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু পুরোনো ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আবার নতুন নীতি তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো, যেখানে রোগীর সামর্থ্য, উৎপাদন ব্যয় এবং ওষুধশিল্পের বাস্তবতা—তিনটিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রথমত, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা দ্রুত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা প্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থাগুলোর মতামত নেওয়া দরকার। তৃতীয়ত, মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি হতে হবে স্বচ্ছ এবং তথ্যভিত্তিক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণ রোগীর স্বার্থকে কেন্দ্রীয় বিবেচনায় রাখতে হবে।
কারণ ওষুধের দাম বাড়লে একজন রোগীর কাছে সেটি কেবল একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত একটি পরিবারের জন্য এর অর্থ হতে পারে মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ ওষুধের পেছনে চলে যাওয়া, অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দেওয়া কিংবা চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়া।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে ওষুধশিল্পকে টেকসই রাখতে হবে, অন্যদিকে জনগণের চিকিৎসা ব্যয়ও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নতুন কাঠামো বাতিল করে সরকার আপাতত ১৯৯৪ সালের ব্যবস্থায় ফিরেছে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রোগের ধরন, ওষুধের বাজার এবং মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ১৯৯৪ সালের মতো নেই।
তাই পুরোনো ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বহাল রাখা গেলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
সরকার নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি কীভাবে তৈরি করে, সেটিই এখন মূল বিষয়। নতুন ব্যবস্থায় যদি স্বচ্ছতা, বিশেষজ্ঞ মতামত, আইনি কাঠামো এবং রোগীর সামর্থ্য—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই একটি ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
আর যদি মূল্য নির্ধারণের মূল আলোচনায় রোগীর সক্ষমতা পিছিয়ে যায়, তাহলে নীতির পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সেই মানুষকেই, যার চিকিৎসার জন্য ওষুধটি প্রয়োজন।

