ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজট কমাতে রেলক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে উড়ালপথ কিংবা নিচ দিয়ে আন্ডারপাস নির্মাণের যে পরিকল্পনা কয়েক বছর আগে করা হয়েছিল, নগরের বদলে যাওয়া অবকাঠামোগত বাস্তবতায় তার বড় একটি অংশ এখন আর কার্যকর থাকছে না। বিভিন্ন করিডরে উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেল নির্মাণের কারণে পুরোনো নকশা নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় রেলওয়ে আবারও রেলক্রসিংয়ের যানজট নিরসনে বাইপাস অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। তবে আগের পরিকল্পনা সরাসরি বাস্তবায়ন না করে নতুন করে সম্ভাব্য স্থান ও প্রকৌশলগত বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। এজন্য নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিকল্পনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে করা আগের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এখন অনেকটাই পুরোনো হয়ে গেছে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফলে কোন রেলগেটে আন্ডারপাস, কোথায় উড়ালপথ এবং কোথায় বিকল্প সড়ক নির্মাণ করা বাস্তবসম্মত হবে, তা নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
রেলওয়ের প্রস্তাবিত নতুন কারিগরি প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে ‘নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর বাইপাস অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর রেলক্রসিংয়ের সমস্যা, বিদ্যমান সড়কব্যবস্থা, নতুন অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ রেল চলাচল—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারণ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুরে ৫০ রেলক্রসিং
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত এলাকায় অন্তত ৫০টি রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত সড়কের পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন লেন ও উপসড়ক গড়ে ওঠার কারণেও এসব রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে।
ঢাকার ভেতরে পরিস্থিতি আরও জটিল। তেজগাঁও থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত মাত্র ছয় কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে নয়টি রেলক্রসিং। কমলাপুর স্টেশন থেকে ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় এসব ক্রসিংয়ে সড়ক যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রায় প্রতি ১৫ মিনিট পরপরই কোনো না কোনো জায়গায় যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হয়।
এর প্রভাব শুধু সড়কের যানজটেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘন ঘন রেলক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনও নির্ধারিত গতিতে চলতে পারে না। একই সঙ্গে ক্রসিং দিয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
অর্থাৎ একই জায়গায় সড়ক ও রেল—দুই ধরনের যান চলাচলের এই সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হয়ে আছে। ট্রেনের সংখ্যা যত বাড়বে, এই সমস্যা তত প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিতিপাড়া আন্ডারপাস দেখিয়েছে সম্ভাবনা
রেলক্রসিং সরিয়ে বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করলে যানজট কতটা কমানো সম্ভব, তার একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া গেছে তিতিপাড়া আন্ডারপাসে।
গত বছর তিতিপাড়া আন্ডারপাস চালুর পর কমলাপুর স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় যানজটের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে মতিঝিল, মুগদা, সবুজবাগ ও মানিকনগর এলাকাতেও।
তিতিপাড়া আন্ডারপাস নির্মাণে সময় লেগেছে দুই বছর। এর দৈর্ঘ্য ৩৩৮ থেকে ৩৫০ মিটার এবং নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৯০০ মিলিয়ন টাকা। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অধীনে নির্মাণকাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট সড়কটি পুরোপুরি বন্ধ রেখে আন্ডারপাসটি তৈরি করা হয়। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয় নভেম্বর ২০২৫-এ।
তবে এই আন্ডারপাসের কারণে পদ্মা রেল সংযোগ পথে ট্রেন চলাচলের গতি কতটা বাড়বে, তা এখনো পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। কারণ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রেন দিয়ে ওই রেলপথের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
তবু সড়ক যানজট কমানোর ক্ষেত্রে তিতিপাড়া আন্ডারপাসের অভিজ্ঞতা রেলওয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই রাজধানীর অন্যান্য রেলক্রসিংয়েও একই ধরনের সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে।
পুরোনো সমীক্ষায় পাঁচ স্থানে সম্ভাবনা ছিল
২০১৮ সালে করা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ঢাকা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত পাঁচটি স্থানে আন্ডারপাস নির্মাণের সম্ভাবনা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব এলাকার অবকাঠামো ও যান চলাচলের ধরন বদলে গেছে। তাই আগের পাঁচটি স্থানও নতুন করে যাচাই করতে হবে।
বিশেষ করে মালিবাগ, মগবাজার ও তেজগাঁওয়ের মতো ব্যস্ত এলাকায় আন্ডারপাস নির্মাণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এসব এলাকায় একদিকে বিপুল পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, অন্যদিকে ঢাকা উড়ালসড়কের অবকাঠামোও গড়ে উঠেছে। ফলে নতুন কোনো আন্ডারপাস নির্মাণ করলে সেটি বিদ্যমান উড়ালসড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটি বড় প্রকৌশলগত প্রশ্ন।
এ কারণেই রেলওয়ের কাছে এখন শুধু আন্ডারপাস নির্মাণই সমাধান নয়। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও বিকল্প বা সমান্তরাল সড়ক এবং কোথাও আন্ডারপাস—এলাকাভেদে কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর হবে, সেটিই নতুন সমীক্ষায় নির্ধারণ করতে হবে।
ট্রেন বাড়লে সড়কের চাপও বাড়বে
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে নতুন কোচ ও ইঞ্জিন যুক্ত হওয়ার পর এই করিডরে ট্রেন চলাচলের সংখ্যা বাড়তে পারে। তখন রেলক্রসিংগুলোতে সড়ক যানবাহন আটকে থাকার সময়ও বাড়বে।
বর্তমানে যে ক্রসিংগুলোতে কয়েক মিনিটের জন্য যান চলাচল বন্ধ হচ্ছে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে সেসব জায়গায় অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। এর ফলে শুধু নির্দিষ্ট রেলক্রসিং নয়, আশপাশের সড়কগুলোতেও যানজট ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় সম্প্রতি ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩৮তম সভায়ও রেলক্রসিংগুলোতে দ্রুত আন্ডারপাস নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটির মতে, রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে যানজটের তীব্রতা কমাতে রেলক্রসিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি। কারণ রেল ও সড়ক—দুই ধরনের পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ একসঙ্গে ঘটছে। একটি ব্যবস্থার উন্নয়ন অন্যটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করলে পুরো নগর পরিবহনব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এক প্রকল্পে সমাধান খোঁজার চেষ্টা
রেলওয়ের নতুন পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এবার শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি রেলক্রসিংয়ের জন্য আলাদা অবকাঠামো তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত পুরো করিডরকে একটি সমন্বিত পরিবহন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর ফলে কোথায় রেলক্রসিং রাখা হবে, কোথায় তা সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন, কোথায় আন্ডারপাস নির্মাণ করা সম্ভব এবং কোথায় বিকল্প সড়ক তৈরি করা বেশি কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর একই সমীক্ষার মাধ্যমে খোঁজা হবে।
তবে কাজটি সহজ হবে না। রেলওয়ের পাশাপাশি রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারি সংস্থা এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ও অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় না করে কোনো নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
রেলওয়ের পরিকল্পনা বিভাগের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেই নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করা হবে। ফলে সমীক্ষাটি শেষ করতেই কিছুটা সময় লাগবে।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ সমন্বয়
ঢাকার রেলক্রসিং সমস্যা মূলত শুধু রেলওয়ের সমস্যা নয়। সড়ক, রেল, উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেল—সব ধরনের পরিবহন অবকাঠামো একই শহরের সীমিত জায়গা ব্যবহার করছে। তাই একটি অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত অন্য প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের সমীক্ষা সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় বর্তমান বাস্তবতায় তার অনেক অংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এবার নতুন পরিকল্পনাও যদি দীর্ঘ সময় ধরে কাগজে আটকে থাকে, তাহলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
অন্যদিকে তিতিপাড়া আন্ডারপাসের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংকে সঠিকভাবে বাইপাস করতে পারলে আশপাশের বড় একটি এলাকার যানজট কমানো সম্ভব। তাই নতুন সমীক্ষায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনা নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন, ব্যয়, জমির প্রয়োজন, বিদ্যমান উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয় এবং ভবিষ্যতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
রাজধানীতে সড়ক ও রেল—দুই ব্যবস্থার চাপই যখন বাড়ছে, তখন রেলক্রসিংয়ের সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। নতুন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সেই সমাধানের পথ দেখাতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কত দ্রুত তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে তার ওপর।

