দীর্ঘ প্রায় অর্ধমাসের তীব্র গ্যাস সংকটের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি। গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন কারখানায় আবার শ্রমিকেরা কাজে ফিরছেন। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, কাঞ্চপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।
তবে সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে—এমনটা বলার সুযোগ এখনো নেই। কোথাও কারখানা পুরো সক্ষমতায় চলছে না, কোথাও আবার উৎপাদন সচল রাখতে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় এখনো বাড়তি রয়েছে।
গাজীপুরের একটি বড় বস্ত্র ও পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে যেখানে তাদের সুতা উৎপাদনকারী কারখানাগুলো মাত্র ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল, এখন সেখানে উৎপাদন ৬০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তার আশা, বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থাও দ্রুত উন্নত হবে।
শিল্প খাতে এই সাময়িক স্বস্তির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো গ্যাস সরবরাহের ধীরে ধীরে বৃদ্ধি। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে দেশের দুটি ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটের একটিতে দুর্ঘটনায় ক্ষতি হওয়ার পর জাতীয় পর্যায়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে।
গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ার পর বাসাবাড়িতে রান্নার জন্য গ্যাসের চাপ কমে যায়। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা দেয়। একই সঙ্গে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে যায়। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ করে শ্রমিকদের ছুটিও দেয়।
গত বুধবার গাজীপুরের ২০০টির বেশি ছোট ও ঠিকাদারনির্ভর পোশাক কারখানা তাদের শ্রমিকদের তিন দিনের ছুটিতে পাঠায়। গ্যাস সংকটের কারণে সাভার, আশুলিয়া, কাঞ্চপুর ও নারায়ণগঞ্জের অনেক কারখানাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ অবস্থায় প্রায় অর্ধমাস পর বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটটি আংশিকভাবে মেরামত করা হয়। পরদিন শুক্রবার এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ওই টার্মিনাল জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে শুরু করে।
গাজীপুরের এবিএম ফ্যাশন লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাজহারুল আলম মিলন জানান, তিন দিনের বন্ধের পর গতকাল তাদের কারখানা আবার খুলেছে। কারখানার সব বিভাগেই কাজ চলছে এবং শ্রমিকেরাও স্বাভাবিকভাবে কাজে ফিরেছেন। তবে উৎপাদন শুরু হলেও গ্যাসের ঘাটতি এখনো রয়েছে বলে তিনি জানান।
গ্যাসের সংকট সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। গাজীপুরের সোয়েটার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মোটেক্স ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ কবির জানান, গত সপ্তাহে যেখানে দুই থেকে তিন দিনে মাত্র এক ট্রাক গ্যাসের বোতল সংগ্রহ করা সম্ভব হতো, এখন সেখানে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ট্রাক গ্যাসের বোতল পাওয়া যাচ্ছে।
তার কারখানায় সরাসরি গ্যাস সংযোগ নেই। ফলে কাছাকাছি সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলজাত গ্যাস কিনেই উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও অনেক কারখানার উৎপাদন এখনো স্বাভাবিক সরবরাহব্যবস্থায় ফিরতে পারেনি।
গাজীপুরের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় তাদের মিল বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। তবে বিদ্যমান কাজের আদেশ সময়মতো পূরণ করতে হলে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, অধিকাংশ কারখানাই আবার খুলেছে। বাকি কারখানাগুলোও আজ খুলে যাওয়ার কথা রয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, গ্যাস সরবরাহের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পাঞ্চলের কর্মচাঞ্চল্যও ধীরে ধীরে ফিরছে।
তবে পোশাকশিল্পের জন্য এই সংকটের সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখন পশ্চিমা দেশগুলোর বড়দিনকেন্দ্রিক পোশাকের চালান পাঠানোর ব্যস্ত মৌসুম। এই সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে সামান্য দেরিও বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কারখানা কয়েক দিন বন্ধ থাকা মানে শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পুরো সরবরাহব্যবস্থার ওপর পড়ে। নির্ধারিত সময়ে পোশাক তৈরি না হলে বন্দরে পণ্য পাঠানো পিছিয়ে যেতে পারে। এরপর ক্রেতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে বিমানপথে পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। আর আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ সমুদ্রপথের তুলনায় অনেক বেশি।
গাজীপুরের ওই বস্ত্র ও পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মনে করেন, উৎপাদন বিলম্বিত হলে প্রতিষ্ঠানকে দুটি কঠিন পরিস্থিতির একটির মুখোমুখি হতে হতে পারে। হয় বেশি খরচ করে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হবে, নয়তো বিদেশি ক্রেতাদের ধরে রাখতে বড় ধরনের মূল্যছাড় দিতে হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই রপ্তানিকারকদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও মনে করেন, গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কারখানাগুলো কতটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পেরেছে তা এখনই বলা কঠিন। পুরোপুরি উৎপাদন স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি শেখ শোয়েব উদ্দোজা চৌধুরীও জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার থেকে গ্যাস সরবরাহে উন্নতি হয়েছে। তবে সরবরাহ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে অনেক কারখানাকে প্রতিদিন অন্তত চার ঘণ্টা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এতে পোশাক উৎপাদনের খরচ সরাসরি বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাসের তুলনায় ডিজেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল। ফলে একটি কারখানা যদি কয়েক ঘণ্টা করে নিয়মিত বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। রপ্তানি বাজারে যেখানে প্রতিযোগিতা তীব্র, সেখানে এই বাড়তি ব্যয় সহজে ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও সম্ভব নয়।
ফলে গ্যাস সরবরাহের বর্তমান উন্নতি শিল্প খাতের জন্য স্বস্তির খবর হলেও সংকটের অর্থনৈতিক ক্ষতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। কয়েক দিনের উৎপাদন বন্ধ, শ্রমিকদের ছুটি, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার, কাঁচামাল ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচিতে পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার জানিয়েছেন, কোনো কোনো পোশাক কারখানা পাঁচ দিন পর্যন্ত বন্ধ ছিল। তবে পরিস্থিতি এখন ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তার মতে, লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি পণ্যের সময়মতো সরবরাহ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অ্যাপারেলস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মো. তৌহিদুর রহমানও কারখানা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, কোথায় কতটা গ্যাস পৌঁছাচ্ছে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হলে সংকটের প্রকৃত চিত্র বোঝা সহজ হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হলো, দেশের শিল্প উৎপাদন এখনো জ্বালানি সরবরাহের ওপর অত্যন্ত সংবেদনশীল। গ্যাসের সরবরাহ সামান্য কমে গেলেই উৎপাদন কমে যায়, শ্রমিকদের ছুটি দিতে হয় এবং রপ্তানি আদেশ ঝুঁকিতে পড়ে। আবার সরবরাহ কিছুটা বাড়লেই বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে শুরু করে।
এই বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোই যথেষ্ট হবে না। শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির সহজলভ্যতা ও ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ সরাসরি বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য চান। একবার সরবরাহে বড় ধরনের ব্যর্থতা হলে শুধু একটি চালান নয়, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট থেকে শিল্প খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন আর শুধু অবকাঠামোগত বিষয় নয়, এটি রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ায় আপাতত বন্ধ কারখানাগুলো উৎপাদনে ফিরছে এবং শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিল্পকারখানাগুলোকে পুরো সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হলে সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করতে হবে। বিশেষ করে বড়দিনের রপ্তানি মৌসুম সামনে রেখে আগামী কয়েক দিন গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা রপ্তানিকারকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ সবচেয়ে কঠিন সময়টি হয়তো পেরিয়ে এসেছে, কিন্তু শিল্প খাত এখনো পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। গ্যাসের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার চাকা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। এখন সেই চাকা যাতে আর থেমে না যায়, সেটিই হবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

