বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিমাপের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ওপর নির্ভর না করে দেশের প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারকে বিবেচনায় এনে অর্থনীতির আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
এই লক্ষ্যে জাতিসংঘের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অর্থনৈতিক পরিমাপ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। নতুন এই ব্যবস্থায় নিট দেশজ উৎপাদন বা এনডিপি হিসাব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিবিএস কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সম্পদ সৃষ্টির বিষয়ে আরও বাস্তব ও নির্ভুল তথ্য তৈরি করা, যাতে নীতিনির্ধারকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
নতুন হিসাব পদ্ধতিটি তৈরি করা হবে সংশোধিত জাতীয় হিসাব কাঠামোর ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরকে নতুন ভিত্তিবছর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রথমবারের মতো এই নতুন হিসাবের তথ্য ২০২৮ সালের এপ্রিল-মে মাসে প্রকাশ করা হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের প্রধান সূচক হলো মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার মোট মূল্যকে জিডিপি বলা হয়।
তবে জিডিপির একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ দেখালেও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়কে সাধারণত হিসাবের মধ্যে আনে না।
নতুন পদ্ধতিতে এই বিষয়টি যুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। অর্থাৎ বন, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও ক্ষয় অর্থনৈতিক হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ জন্য বিবিএস জাতিসংঘের পরিবেশ-অর্থনৈতিক হিসাব ব্যবস্থা বা এসইইএ কাঠামো জাতীয় হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এই পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অর্থনীতি শুধু কত পণ্য উৎপাদন করছে সেটি দিয়ে বিচার করা যায় না। কারণ অনেক সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির পেছনে যদি প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো দেশ যদি অতিরিক্তভাবে বন উজাড় করে, খনিজ সম্পদ উত্তোলন করে বা মৎস্য সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে স্বল্পমেয়াদে আয় বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
নতুন হিসাব পদ্ধতির মাধ্যমে মূলত বোঝার চেষ্টা করা হবে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকৃত অর্থে টেকসই সম্পদ তৈরি করছে, নাকি ভবিষ্যতের সম্পদ কমিয়ে বর্তমান প্রবৃদ্ধি দেখাচ্ছে।
বিবিএস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়ের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এজন্য নতুন তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার তথ্য ব্যবহারের প্রয়োজন হবে।
জাতীয় হিসাব ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিবিএস নিট জাতীয় ব্যবহারযোগ্য আয় বা এনএনডিআই হিসাব করার পরিকল্পনাও করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ মোট দেশজ উৎপাদন ও মোট জাতীয় আয় বা জিএনআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক প্রকাশ করে। নতুন ব্যবস্থায় এসব সূচকের পাশাপাশি দেশের প্রকৃত সম্পদ অবস্থার আরও বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বিশ্বে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার নয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ার কারণে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই ধরনের হিসাব ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এতে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ সম্পদের অবস্থাও বিবেচনায় আনা সম্ভব হবে।
বিবিএসের এই উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, দেশের প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টি, প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতার আরও পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে।

