বাজারে কোনো পণ্যের দাম বাড়লেই সাধারণ মানুষের প্রথম অভিযোগ ওঠে—‘সিন্ডিকেট’। কোথাও ব্যবসায়ীরা পণ্য আটকে রেখেছেন, কোথাও বেশি দামে বিক্রি করছেন, আবার কোথাও কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। এসব অভিযোগের কিছু ক্ষেত্রে বাস্তব ভিত্তি থাকলেও বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির পুরো কারণকে শুধু বাজার সিন্ডিকেট দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ গত কয়েক বছর ধরে দেশে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের পণ্যের দামই তুলনামূলক বেশি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৬৮ শতাংশে নামলেও তা টানা চতুর্থ বছরের মতো ৮ শতাংশের ওপরে ছিল। জুনেও পণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অর্থাৎ সমস্যা শুধু কোনো একটি বাজারে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কারসাজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনীতির ভেতরে এমন কিছু দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, যেগুলো বারবার দাম বাড়ার সুযোগ তৈরি করছে।
বাজারে সিন্ডিকেট বা অতিরিক্ত বাজারক্ষমতা অবশ্যই একটি কারণ হতে পারে। কোনো পণ্যের আমদানি, মজুত, পরিবহন বা পাইকারি বিক্রির বড় অংশ যদি অল্প কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতা কমে যায়। তখন সরবরাহ কমে গেলে বা আমদানির খরচ বাড়লে সেই বাড়তি খরচের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে গবেষণাতেও দেখা গেছে, কৃষকের উৎপাদন খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা এবং শহরের পাইকারি বাজারে কিছু ব্যবসায়ীর শক্ত অবস্থান—সবকিছু মিলে ভোক্তার কাছে দাম বাড়তে পারে। আবার কিছু পণ্যের আমদানি থেকে শুরু করে গুদাম, পরিবহন ও পাইকারি বিতরণ পর্যন্ত একই ধরনের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থাকলে প্রতিযোগিতা আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—সব দাম বাড়াকেই সিন্ডিকেটের কারসাজি বলা যাবে না। কোনো পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি খরচ সত্যিই বেড়ে গেলে, সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়বেই।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশ তাই অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত। দেশের অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্য বা অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারেও আসে। আবার টাকার বিনিময়মূল্য দুর্বল হলে একই পণ্য আমদানি করতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগে। পরিবহন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, উৎপাদন ও ব্যবসার অন্যান্য খরচ বাড়লেও সেই চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে চলে আসে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে আমদানি ব্যয়, সরবরাহের সমস্যা, জ্বালানি ব্যয় এবং বিনিময় হারের চাপের কথা উল্লেখ করেছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামে নতুন চাপ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ঝুঁকিও বেড়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলেও দেশের ভেতরের পরিবহন, মজুত, সরবরাহ ও অন্যান্য খরচ যদি বেশি থাকে, তাহলে সেই সুবিধা পুরোপুরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
তাই বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি কমাতে শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে বা সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। বাজার কারসাজি যেখানে আছে, সেখানে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও কঠোর নজরদারি দরকার; কিন্তু একই সঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা সহজ করা, পরিবহন ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো, আমদানি প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা এবং উৎপাদন খরচ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকও মূল্যস্ফীতি কমাতে শুধু মুদ্রানীতি নয়, অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাজারে একজন ব্যবসায়ীকে দোষী করলেই যদি পরের বছর আবার একই পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে বোঝা যাবে সমস্যাটি আরও গভীরে। বাংলাদেশের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি বাজারব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সরবরাহ ঠিক থাকবে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা দেশের ভোক্তার ওপর যতটা সম্ভব কম পড়ে।

