রপ্তানি বাজার আরও বিস্তৃত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর প্রস্তুতির পাশাপাশি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ বাণিজ্য জোট রিসিপেতে যোগ দেওয়ার চেষ্টাও জোরদার করেছে ঢাকা।
দুই উদ্যোগই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। অন্যদিকে রিসিপেতে যুক্ত হতে পারলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে আনুষ্ঠানিক চিঠি বিনিময় হয়েছে। আগামী মাস থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, আগস্টের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার সময়সূচি পাওয়া যাবে বলে তারা আশাবাদী। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের প্রধান বাণিজ্য প্রতিনিধিকে নিয়োগ দিয়েছে।
বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্ব অনেক বেশি। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পণ্য বাণিজ্যের ০.৫ শতাংশ নিয়ে বাংলাদেশ ছিল জোটটির ৩৫তম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। বিপরীতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের ২১.৫ শতাংশের অংশীদার ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে, তার তুলনায় আমদানি কম হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল।
বাংলাদেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নমুখী রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। ২০২৫ সালে জোটটিতে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশ ছিল বস্ত্রপণ্য।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশ বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে এই শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় বাংলাদেশ প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য রপ্তানি করেছে। ওই বছর সুবিধাটি ব্যবহারের হার ছিল ৯৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণও কম নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগের মজুত ছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮৬ মিলিয়ন ইউরো।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি রিসিপেতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এ উদ্দেশ্যে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর করছেন। রিসিপেতে বাংলাদেশের সদস্যপদের পক্ষে সমর্থন আদায় করাই এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
রিসিপে হলো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫ দেশের একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এতে আসিয়ানের ১০টি দেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া রয়েছে। বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ এই বাণিজ্য জোটের আওতাভুক্ত। সব মিলিয়ে এর অর্থনৈতিক পরিসর প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাংলাদেশের রিসিপেতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক শর্তগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে।
এ ক্ষেত্রে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিকেও একটি সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ঠিক কবে রিসিপের সদস্য হতে পারবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এবং রিসিপেতে যোগদানের প্রচেষ্টা সফল হলে বাংলাদেশের সামনে নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই দুটি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

