বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক অবস্থানে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেকর্ড উদ্বৃত্ত হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই উদ্বৃত্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে বাণিজ্য বা চলতি হিসাবের উন্নতির চেয়ে আর্থিক হিসাবে বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের বড় ভূমিকা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৩৮ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, একই সময়ে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের ঋণ এবং অন্যান্য অর্থায়নের মাধ্যমে এই হিসাবে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে। স্বল্পমেয়াদি আন্তঃদেশীয় অর্থায়নের একটি মাধ্যম বাণিজ্য ঋণও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবের এই বিপরীতমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের বৈদেশিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে। একদিকে পণ্য বাণিজ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ঋণ ও অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ সেই চাপ অনেকটাই সামলে দিয়েছে।
অর্থবছরটিতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে রপ্তানি আয় সামান্য কমে ৪৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ শতাংশেরও বেশি।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বাড়তি চাপও ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের আমদানিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরটিতে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানি বাবদ ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। পাশাপাশি মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানিও প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের পরিবেশে কিছুটা গতি ফেরায় মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়লেও সামগ্রিক বৈদেশিক অবস্থানকে এখনই উদ্বেগজনক মনে করছেন না বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম।
তার মতে, বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্য এখনো স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রয়েছে। রপ্তানি আয়ে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দেওয়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি আপাতত বড় উদ্বেগের কারণ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম আরও বলেন, বিনিময় হারসংক্রান্ত নীতির কারণে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময়মূল্য তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এর ফলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহও সমর্থন পেয়েছে।
তবে আরেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, বৈদেশিক লেনদেনের উন্নতির একটি বড় অংশ এসেছে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধির মাধ্যমে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই অর্থনীতিবিদের মতে, এ ধরনের অর্থপ্রবাহ স্বল্পমেয়াদে দেশের বৈদেশিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এসব ঋণ পরিশোধের দায়ও তৈরি হবে।
তার মতে, বিদেশ থেকে আসা বাড়তি অর্থপ্রবাহের ফলে আপাতত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পুনর্গঠন এবং দেশের বৈদেশিক তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবাহের ধরন ও এর সঙ্গে তৈরি হওয়া ঋণ পরিশোধের দায়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
সব মিলিয়ে অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর পরিসংখ্যান বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের একটি পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরছে। বাণিজ্য ও চলতি হিসাবে চাপ অব্যাহত থাকলেও ঋণসহ অন্যান্য আর্থিক অর্থপ্রবাহ সেই ঘাটতি অনেকটাই সামলে দিয়েছে। এর ফলেই দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রেকর্ড ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তে পৌঁছেছে।

