বাংলাদেশে যে কারখানায় পোশাক তৈরি হয়, যে কৃষক জমিতে চাষ করেন কিংবা যে নির্মাণকাজ চলছে—এসবের পেছনে কোনো না কোনো যন্ত্র, যন্ত্রাংশ বা সরঞ্জাম লাগে। এসবের বড় একটি অংশ তৈরি করে দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও শিল্পটি এখনো দেশের বড় রপ্তানি শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। প্রশ্ন হলো, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন?
বড় শিল্পায়নের সম্ভাবনা
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে শুধু ছোট যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরি বোঝায় না। কৃষিযন্ত্র, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ছাঁচ, বিভিন্ন ধরনের ধাতব পণ্য এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবাও এর অংশ। অর্থাৎ এই শিল্প বড় কোনো একটি কারখানার ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট উদ্যোক্তা মিলেই এর ভিত্তি তৈরি করেছেন। এখানেই এর বড় শক্তি—এবং বড় দুর্বলতাও।
দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ
দেশের অনেক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজারের জন্য ভালো মানের পণ্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিদেশি বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু পণ্য বানাতে পারলেই হয় না। প্রয়োজন নির্দিষ্ট মান, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, পরীক্ষাগারের সুবিধা, দক্ষ কর্মী এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতার চাহিদা বোঝার সক্ষমতা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ পোশাকের বাইরের শিল্পগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ, শ্রম ও মানসংক্রান্ত শর্ত পূরণের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। সমস্যাটি তাই শুধু ‘পণ্য বিদেশে বিক্রি হচ্ছে না’—এত সরল নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য নিজেদের পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পারেনি।
বিশ্বমানের উৎপাদনে ঘাটতি
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে একই ধরনের পণ্য দেশেই তৈরি করা সম্ভব হলেও বিদেশি উৎপাদকের সঙ্গে দামের ও মানের প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, নির্ভুল মাপজোক এবং মান নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। ছোট উদ্যোক্তার জন্য এই বিনিয়োগ সহজ নয়। তার ওপর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিশ্চয়তা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসা পরিচালনার নানা খরচ যুক্ত হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ে। ফলে স্থানীয় বাজারে টিকে থাকা সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ এখন তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন রপ্তানি খাত খুঁজছে। বিশ্বব্যাংক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংকে এমন কয়েকটি শিল্পের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক একটি কর্মসূচিতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কয়েকটি অ-পোশাক খাতে সহায়তা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের উদাহরণও পাওয়া গেছে। এখানেই বাংলাদেশের সুযোগ। কৃষিযন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, শিল্পযন্ত্রের অংশ, গাড়ির যন্ত্রাংশ কিংবা বিভিন্ন ধাতব পণ্যের চাহিদা শুধু দেশের বাজারে নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও রয়েছে। কিন্তু সেই বাজার ধরতে হলে ‘আমরা তৈরি করতে পারি’ থেকে ‘আমরা আন্তর্জাতিক মানে তৈরি করতে পারি’—এই জায়গায় যেতে হবে।
শিল্পের সম্ভাবনা ফেরানোর পথ
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংকে বড় শিল্পে পরিণত করতে হলে শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর দায়িত্ব দিলে হবে না। প্রযুক্তি আধুনিকীকরণ, দক্ষ কর্মী তৈরি, মান পরীক্ষার সুবিধা, সহজ অর্থায়ন এবং দ্রুত আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা—সবকিছুকে একসঙ্গে এগোতে হবে। বিশ্বব্যাংকের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক মান ও পরিবেশগত এবং শ্রমসংক্রান্ত শর্ত পূরণে সহায়তা পেলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশের শিল্পায়নের পরবর্তী ধাপ যদি শুধু বড় কারখানা তৈরি করা না হয়ে দেশীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়, তাহলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সেই পরিবর্তনের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে। সম্ভাবনাটি তাই হারিয়ে যায়নি। বরং এতদিন শিল্পটি মূলত দেশের বাজারের প্রয়োজন মেটাতেই ব্যস্ত ছিল। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এই স্থানীয় শিল্পকে কীভাবে আন্তর্জাতিক শিল্পে পরিণত করা যায়। সেটিই ঠিক করতে পারলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু আমদানি বিকল্প হবে না, বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি শক্তিও হয়ে উঠতে পারে।

