সৃজনশীল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করতে জাতীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২৭ সদস্যের জাতীয় পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের পাশাপাশি খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেওয়াই হবে এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব।
গতকাল প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ সচিব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলও কমিটিতে রয়েছেন।
সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় থাকা বিভিন্ন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার ইতোমধ্যে খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই কমিটি এসব পরিকল্পনা অনুমোদন করবে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা এগোচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করবে।
কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা। একই বিষয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করলে যাতে নীতিগত অসামঞ্জস্য বা কাজের পুনরাবৃত্তি না হয়, সে বিষয়েও কমিটি দিকনির্দেশনা দেবে।
এ ছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতির বিভিন্ন খাত নিয়ে গঠিত আলাদা কমিটিগুলোর কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হবে। কোনো খাতে নীতিগত সমস্যা, বাস্তবায়নের ঘাটতি কিংবা সমন্বয়ের অভাব দেখা দিলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকবে জাতীয় পরিচালনা কমিটির।
কমিটির কাজ শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতি তিন মাস পরপর খাতভিত্তিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। কমিটির কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক সহায়তা দেবে অর্থ বিভাগ।
বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতি এখন কর্মসংস্থান, রপ্তানি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নকশা, পোশাক, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বিনোদনসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত। বাংলাদেশেও এসব খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে খাতগুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।
সরকারের নতুন উদ্যোগটি সেই ঘাটতি কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি নীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সৃজনশীল খাতের পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে এ খাতের বিকাশের সুযোগ বাড়তে পারে।
জাতীয় বাজেটে ঘোষিত বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ কর্মসূচির সঙ্গেও এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা, ব্যবসার সক্ষমতা বাড়ানো এবং কাঠামোগত পরিবর্তনকে এগিয়ে নেওয়াই ওই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির সময় অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রচলিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন খাতের বিকাশ ঘটাতে পারলে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব।
তবে নতুন কমিটির কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। নিয়মিত পর্যালোচনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সৃজনশীল অর্থনীতিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

