বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বড় প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না বাংলাদেশের আইসিটি রপ্তানি। সরকারি লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।
দক্ষ জনবলের সংকট, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, নীতিগত জটিলতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন করতে না পারার কারণে দেশের প্রযুক্তি খাত এখনো বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে আইসিটি খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টেলিযোগাযোগ, কম্পিউটার ও তথ্যসেবা খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৭২৪.৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের মাত্র ১৪.৫ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
এই ব্যবধান শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের প্রযুক্তি খাতের বর্তমান সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ একই সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ প্রযুক্তি রপ্তানিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশকে এখন আগের চেয়ে আরও কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
বিনিয়োগ সংকট আটকে দিচ্ছে প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি
বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব। প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ সাধারণত শুরুতে বেশি অর্থের প্রয়োজন হয় এবং লাভজনক হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই কারণে অনেক বড় বিনিয়োগকারী প্রযুক্তি খাতে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহ হারান।
প্রযুক্তি ব্যবসার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও দেশে এখনো সীমিত। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বড় পরিসরের অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের সম্প্রসারণ করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নের জন্য শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই হবে না, তাদের বড় হওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা, সহজ অর্থায়ন এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
দক্ষ কর্মীর অভাব বড় দুর্বলতা
বাংলাদেশের আইসিটি খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মীর ঘাটতি। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট শিক্ষা শেষ করলেও তাদের অনেকের দক্ষতা আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক সফটওয়্যার উন্নয়ন, তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষের সংখ্যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম এবং শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যেও রয়েছে বড় পার্থক্য। ফলে অনেক নতুন স্নাতক চাকরিতে প্রবেশের পর অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করেন।
প্রযুক্তি খাতের বর্তমান বাস্তবতায় শুধু সাধারণ প্রোগ্রামিং বা প্রাথমিক প্রযুক্তি দক্ষতা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে উচ্চ পর্যায়ের সমস্যা সমাধান, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতা তৈরি করতে হবে।
নীতিগত জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধাও কম নয়
সরকার প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ ও নীতি গ্রহণ করলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক লেনদেন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দেয়। প্রযুক্তি খাতের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি ক্ষেত্রে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বিশ্ব প্রযুক্তি বাজার প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি, নতুন ব্যবসায়িক মডেল এবং নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনতে না পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
রপ্তানি বাড়লেও এখনো পুরোনো রেকর্ড অতিক্রম করতে পারেনি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি সেবা রপ্তানিতে বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা হয়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে টেলিযোগাযোগ, কম্পিউটার ও তথ্যসেবা খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৪৩৬.৬৬ মিলিয়ন ডলার। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭৩৮.৭৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে রপ্তানি আয় কমে ৬৬৪.৪৯ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
পরবর্তীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে হয় ৬৭২.৬৪ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৪.৬ মিলিয়ন ডলারে। এতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৭.৭ শতাংশ।
তবে সর্বশেষ এই আয়ও এখনো ২০২১-২২ অর্থবছরের ৭৩৮.৭৯ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড অতিক্রম করতে পারেনি।
কম মূল্য সংযোজনকারী কাজের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে
বাংলাদেশের আইসিটি রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হলো কম্পিউটার সেবা। এর মধ্যে সফটওয়্যার তৈরি, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, সার্ভার ব্যবস্থাপনা, পরামর্শ সেবা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো কাজ রয়েছে।
তবে এসব কাজের বড় অংশ এখনো কম মূল্য সংযোজনকারী। বাংলাদেশ মূলত আউটসোর্সিং, সাধারণ সফটওয়্যার তৈরি, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং নকশা তৈরির মতো কাজে বেশি নির্ভরশীল।
এর ফলে রপ্তানি আয় বাড়লেও একজন কর্মীর উৎপাদনশীলতা বা প্রতিটি কাজের আর্থিক মূল্য তেমন বাড়ছে না।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে উচ্চমূল্যের সেবার গুরুত্ব বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ, জটিল সফটওয়্যার সমাধান এবং গবেষণাভিত্তিক প্রযুক্তি সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সীমিত পর্যায়ে আটকে থাকতে পারে।
পরিবর্তিত প্রযুক্তি বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির দৈনিক অবজারভারকে বলেন, প্রযুক্তি খাতে কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু দেশের দক্ষতা উন্নয়ন সেই গতিতে এগোচ্ছে না।
তার মতে, অতীতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ধরনের আউটসোর্সিং ও প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ পেত। কিন্তু বর্তমানে এসব কাজের অনেক অংশ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মতো এসব কাজ বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের কাছে পাঠাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দেশের ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের দক্ষতা উন্নত করতে পারেনি। এর ফলে বাংলাদেশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক এবং উচ্চমূল্যের কাজ পাচ্ছে না।
তার মতে, এসব কাজ বর্তমানে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে বেশি যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের জন্য কৌশল পরিবর্তন জরুরি
বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে এখন শুধু কম খরচের শ্রম দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। একসময় বাংলাদেশের বড় সুবিধা ছিল তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়। কিন্তু বর্তমানে দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশকে যদি ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো বড় রপ্তানি লক্ষ্য অর্জন করতে হয়, তাহলে প্রযুক্তি খাতের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী তৈরি করলেই হবে না, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা, উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ সহজ করা এবং উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সেবা তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের সামনে এখনো বড় সুযোগ রয়েছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ এবং বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা এই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি হতে পারে।
তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে পুরোনো আউটসোর্সিং নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বাজারে সফল হতে হলে বাংলাদেশকে এমন একটি অবস্থানে যেতে হবে, যেখানে দেশ শুধু সস্তা শ্রম সরবরাহ করবে না, বরং উদ্ভাবনী ও উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সমাধান তৈরি করবে।
৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য এখনো অর্জনের বাইরে নয়, কিন্তু বর্তমান গতিতে সেই লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন। প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষতা, বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

