দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল অবশেষে নতুন প্রাণ ফিরে পেতে যাচ্ছে। খুলনা ও দিনাজপুরের এই কারখানাগুলো ইজারা নিচ্ছে দেশের দুটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী, যারা মিলিয়ে মোট এক হাজার ৫০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে সেখানে। তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে জুতা, খেলনা, আসবাব, বিচিত্র ধরনের পাটজাত পণ্য এবং লিথিয়াম ব্যাটারি—এই বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত হবে নানা ধরনের পণ্য। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের।
খুলনার খালিশপুরে অবস্থিত প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল আগামী ৩০ বছরের জন্য ইজারা পাচ্ছে ব্যাটারি খাতের একটি পরিচিত শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য ও প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনকারী একটি গ্রুপ।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, খুলনা ও দিনাজপুরের এই তিনটি পাটকল সংশ্লিষ্ট দুই শিল্পগোষ্ঠীকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদনের কথাও জানান তিনি।
বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভজনকভাবে চললেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকলগুলো বছরের পর বছর ধরে বিপুল লোকসান গুনে আসছিল। এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক ক্ষতি সামলাতে না পেরে একসময় প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে পাঠিয়ে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকার মোট ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিল প্রকৃত পাটকল, বাকি কয়েকটি ছিল অন্যান্য ধরনের কারখানা।
পাটকল বন্ধের পর সেগুলো ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতের হাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত মোট ১৪টি পাটকল বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৯টিতে ইতিমধ্যে উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু হয়ে গেছে। এসব কারখানার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে নয় হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
খুলনা ও সিরাজগঞ্জের দুটি পাটকল ইজারা নিয়ে সেখানে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী গ্রুপ। দুটি কারখানা মিলিয়ে সেখানে কর্মসংস্থান হবে সাড়ে ১১ হাজার মানুষের।
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনার এই পাটকলের প্রায় ৫৬ একর জমির একটি বড় অংশ ইজারা পাচ্ছে এই গ্রুপ, যেখানে উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্য, আসবাব ও কাঠের বিকল্প বোর্ড উৎপাদনে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এতে সরাসরি কাজ পাবেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ, এবং কারখানাটি থেকে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের পাটকলের একটি বড় অংশ ইজারা নিয়ে সেখানে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হবে। কাঁচামাল সংরক্ষণাগার ও প্যাকেজিং সুবিধাসহ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, যেখানে কর্মসংস্থান হবে সাড়ে ছয় হাজার মানুষের। বার্ষিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
এই গ্রুপের একজন বিপণন পরিচালক জানিয়েছেন, নতুন এই দুটি কারখানায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানির জন্যও পণ্য তৈরি করা হবে, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শুরুর প্রত্যাশা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, নতুন করে জমি কিনে কারখানা নির্মাণ করতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যায়, কিন্তু প্রস্তুত জমি হাতে পেলে অনেক দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়, যাতে সময় ও অর্থ—দুটোই সাশ্রয় হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাজশাহীর একটি টেক্সটাইল মিল ও একটি জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু করেছে এই একই গ্রুপ, যেখানে বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার মানুষ কর্মরত আছেন এবং শিগগিরই এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনার পাটকলের একটি বড় অংশ ইজারা পাচ্ছে ব্যাটারি শিল্পে সুপরিচিত অপর গ্রুপটি। তারা সেখানে মোট ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দুটি পৃথক কারখানা স্থাপন করবে, যাতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের।
জানা গেছে, এই দুটি কারখানার একটিতে তৈরি হবে পাটের বিশেষায়িত ম্যাট্রেস, যা বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হবে। এই প্রকল্পটি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে বাস্তবায়ন করা হবে। অপর কারখানাটিতে তৈরি হবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, যার জন্য প্রয়োজনীয় সেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হবে।
আশির দশকের মাঝামাঝি ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই গ্রুপ পরবর্তী সময়ে প্লাস্টিকের গৃহস্থালি পণ্য, আসবাব, রান্নার সামগ্রী, চামড়া ও খেলাধুলার জুতা, টায়ার এবং বৈদ্যুতিক গৃহস্থালি পণ্যের ব্যবসায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে।
এই গ্রুপের একজন কোম্পানি সচিব জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন আগামী তিন মাসের মধ্যে পাটকলটি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পরই কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হবে, এবং তাঁরা আশা করছেন এক বছরের মধ্যেই দুটি কারখানাই পুরোদমে চালু করতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা রাষ্ট্রীয় শিল্প-অবকাঠামোয় বেসরকারি বিনিয়োগের এই ধারা শুধু কর্মসংস্থানই তৈরি করবে না, বরং দেশের রপ্তানি খাতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

