বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা আপাতত কেটে গেছে। বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ ও কিছু ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিতের যে সিদ্ধান্ত ইউরোপের অন্যতম বড় ফ্যাশন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান পোল্যান্ডভিত্তিক এলপিপি নিয়েছিল, ১২ দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সঙ্গে আলোচনার পর এলপিপি জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং আগের মতোই এখানকার কারখানাগুলো থেকে পোশাক সংগ্রহ করবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সম্পর্ক নিয়ে যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত দূর হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এলপিপি যদি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকত, তাহলে বছরে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত। শুধু রপ্তানি আয় নয়, এর প্রভাব পড়তে পারত দেশের শত শত পোশাক কারখানা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থানের ওপরও। সে কারণে প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু সোমবার জানান, এলপিপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর উভয় পক্ষ একটি যৌথ বিবৃতিতে সম্মত হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে এলপিপির ব্যবসা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাশিয়ায় আটকে থাকা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অর্থ উদ্ধারের বিষয়েও সহযোগিতার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
এই আলোচনার পেছনে রয়েছে আরেকটি বড় আর্থিক সংকট। রাশিয়ার খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এফইএস রিটেইলের কাছে বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি পোশাক কারখানার প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার পাওনা দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এ অর্থ আদায় করতে না পারায় সংশ্লিষ্ট পোশাক রপ্তানিকারকেরা আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছেন।
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এলপিপির ঢাকার কার্যালয়ের ভূমিকা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এফইএসের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাজনিত বিভিন্ন জটিলতার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পাওনা অর্থ আদায় কঠিন হয়ে পড়ে।
পাওনা অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের আশ্রয় নেওয়ায় বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই গত ৩০ জুলাই এলপিপি বাংলাদেশ থেকে নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ, পণ্য উন্নয়ন এবং কিছু ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করায় তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে স্বস্তি ফিরেছে।
বাংলাদেশের জন্য এলপিপির গুরুত্বও কম নয়। প্রতিষ্ঠানটির জন্য দেশের প্রায় ৭৭২টি কারখানা ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে এলপিপির কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পোশাক রপ্তানি হয়। ফলে এত বড় একটি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর জন্য নয়, সামগ্রিক রপ্তানি খাতের জন্যও বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারত।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে তৈরি পোশাক শিল্প যখন বৈশ্বিক বাজারে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে, তখন বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ধরে রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে পোশাক রপ্তানিকারকদের সামনে এমনিতেই নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে বড় কোনো ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে সরে গেলে তার প্রভাব একাধিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এলপিপির সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে সেই আশঙ্কা আপাতত দূর হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কারণ, এর সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানি সম্ভাবনার বিষয়ও জড়িত।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নেতারা মনে করছেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ায় আটকে থাকা প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার পাওনা উদ্ধারের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এখানেই কাজ শেষ নয়। এলপিপির সঙ্গে ব্যবসা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি রাশিয়ায় আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া জরুরি। কারণ, প্রায় ৪০টি পোশাক কারখানার অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিতে, বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেই হবে না; আস্থা, স্বচ্ছতা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এলপিপির সঙ্গে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, ৩০ জুলাইয়ের সিদ্ধান্তের পর যে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এলপিপির নতুন সিদ্ধান্তে তা আপাতত কেটে গেছে। এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে রাশিয়ায় আটকে থাকা ৪০ মিলিয়ন ডলার পাওনা উদ্ধারে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।

