মাসের বাজার করতে গিয়ে অনেকেরই এখন একই প্রশ্ন খবরে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হচ্ছে, তাহলে চাল, মাছ, মাংস, তেল, সবজি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের মতোই বেশি কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ‘মূল্যস্ফীতি কমা’ আর ‘পণ্যের দাম কমা’এই দুই বিষয়ের পার্থক্যে। সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, জুন ২০২৬-এ দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসের ৯ দশমিক ৪২ শতাংশের চেয়ে কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে এসেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বাজারের আগের দামগুলোও কমে গেছে। বরং এর অর্থ হলো, এক বছর আগের তুলনায় দাম এখনো বাড়ছে, শুধু সেই বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে।
বিষয়টি সহজভাবে বোঝা যায় একটি উদাহরণ দিয়ে। কোনো পণ্যের দাম যদি গত বছর ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়, এরপর সেই দাম আর না বেড়ে ১২০ টাকাতেই স্থির থাকে, তাহলে ওই পণ্যের দাম কমেনি। কিন্তু নতুন করে দাম বাড়ার গতি শূন্য হয়ে গেছে। একইভাবে, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে নামলে তার অর্থ বাজারের দাম ২ শতাংশ কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় কম গতিতে দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ও সেবার দামের বৃদ্ধির হার হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাই মূল্যস্ফীতি কমার খবর শুনে বাজারে সরাসরি দাম কমবে এমন প্রত্যাশা অর্থনীতির হিসাবে ঠিক নয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্যেও এই পার্থক্য স্পষ্ট। জুনে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামলেও জাতীয় ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়ে ১৪৬ দশমিক ১১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। মে মাসে এই সূচক ছিল ১৪৫ দশমিক ৬১। অর্থাৎ একদিকে বার্ষিক দামের বৃদ্ধির হার কমেছে, অন্যদিকে মাসের ব্যবধানে ভোক্তাদের জন্য সামগ্রিক পণ্যের মূল্যস্তর আরও ওপরে উঠেছে। জুনে মাসভিত্তিক ভোক্তা মূল্যসূচক প্রায় ০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বাজারে গিয়ে একজন ক্রেতার কাছে দাম কমে যাওয়ার অনুভূতি না থাকাটাই স্বাভাবিক।
তাহলে মূল্যস্ফীতি কমল কীভাবে? এর বড় একটি কারণ খাদ্যপণ্যের দামের চাপ কিছুটা কমে আসা। মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ থাকলেও জুনে তা ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মৌসুমি কৃষিপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং স্থানীয় খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি এতে ভূমিকা রেখেছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম কমে যাওয়ার বদলে কিছু খাতে নতুন করে দাম বাড়ার চাপ কিছুটা কমেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমদানির খরচ। বাংলাদেশ খাদ্য, জ্বালানি, কাঁচামাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে আমদানিকারকদের খরচে কিছুটা স্বস্তি আসে। জুনে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সার আশপাশে স্থিতিশীল থাকায় আমদানি করা কাঁচামালের খরচের ওপর চাপ কিছুটা কমেছিল বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কিন্তু আগের সময়ে ডলারের দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়ার যে চাপ ব্যবসায়ীদের ওপর তৈরি হয়েছে, সেটি একদিনে উধাও হয়ে যায় না। আমদানিকারককে আগের বেশি দামে কেনা পণ্য বিক্রি করতে হলে সেই পুরোনো খরচও বাজারদরে থেকে যেতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয় পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শ্রম ও অর্থায়নের খরচ। একটি পণ্য আমদানির পর দোকানে পৌঁছানোর আগেই একাধিক ধাপ অতিক্রম করে। কোনো একটি পর্যায়ে খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব পরের পর্যায়েও যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কাঁচামালের দাম কমলেও দেশের বাজারে সেই সুবিধা পুরোপুরি পৌঁছাতে সময় লাগে। আবার ব্যবসায়ী যদি বেশি দামে আগের চালান কিনে থাকেন, নতুন কম দামের পণ্য বাজারে আসার আগ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পুরোনো দামের প্রভাব থাকতেই পারে। এই কারণে আন্তর্জাতিক বা পাইকারি বাজারে কিছুটা স্বস্তি এলেও খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন তাৎক্ষণিক দেখা যায় না।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি শুধু চাহিদার কারণে তৈরি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত মূল্যায়ন নিয়ে ব্র্যাক ইপিএল-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের মূল্যস্ফীতির সমস্যা এখন অনেকটাই সরবরাহনির্ভর। বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্য, জ্বালানি ও সারের দাম, অভ্যন্তরীণ বাজারের ঘাটতি এবং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন বাধা সব মিলিয়ে দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বা মানুষের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে এই মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বাজারে পণ্য কীভাবে আসছে, আমদানি কতটা সহজ হচ্ছে, কৃষিপণ্য কীভাবে পরিবহন হচ্ছে এবং জ্বালানি সরবরাহ কেমন এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জুনে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশের কাছাকাছি, কিন্তু একই সময়ে জাতীয় মজুরি হার সূচক বেড়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে প্রায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। এর অর্থ হলো, আয় কিছুটা বাড়লেও একই সময়ে পণ্য ও সেবার দাম তুলনামূলক দ্রুত বাড়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। একজন কর্মজীবীর বেতন যদি বছরে ৮ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু তার নিয়মিত খরচের দাম ৯ শতাংশের বেশি হারে বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে সে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারে।
এই জায়গাতেই ‘মূল্যস্ফীতি কমেছে’ কথাটির সঙ্গে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার পার্থক্য তৈরি হয়। একজন ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার কেন কমল, সেটি হিসাব করে বাজারে যান না; তিনি দেখেন মাসের শেষে বাজার, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর হাতে কত টাকা থাকে। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যপণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি অবস্থানে ছিল। একইভাবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ থাকায় বাসস্থান, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য খরচেও স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। ফলে পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের স্বস্তি না আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
আরও একটি বিষয় হলো ‘বেস ইফেক্ট’। আগের বছর কোনো পণ্যের দাম যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, পরের বছর সেই উচ্চ দামের ওপর নতুন করে হিসাব করার কারণে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলক কম দেখাতে পারে। বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের ১০ দশমিক ০৩ শতাংশের চেয়ে কম। কিন্তু এই কমার একটি অংশ এসেছে আগের বছরের উচ্চ মূল্যস্তরের সঙ্গে তুলনার কারণে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানে বৃদ্ধির হার কমে গেলেও বাজারে যে মূল্যস্তর ইতিমধ্যে অনেক ওপরে উঠে গেছে, সেটি আগের জায়গায় ফিরে আসেনি।
এ কারণেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী ধাপ আরও কঠিন। এখন শুধু দাম বাড়ার গতি কমালেই হবে না; দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে থাকা মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মানুষের আয় যেন সেই খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মডেল নিয়ে ব্র্যাক ইপিএলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেও মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুনে ৮ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমার পথটি দ্রুত বা সহজ হবে না।
তাই বাজারে স্বস্তি ফিরেছে কি না, সেটি শুধু মূল্যস্ফীতির একটি সংখ্যায় বোঝা যাবে না। দেখতে হবে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম কতটা স্থিতিশীল হচ্ছে, আমদানি ব্যয় কমছে কি না, ডলারের বাজার কতটা স্থির, পরিবহন ও জ্বালানি খরচের চাপ কোথায় দাঁড়িয়েছে এবং মানুষের আয় কতটা বাড়ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতির হারকে ধীরে ধীরে নিচে নামানোর পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার চাপ কমবে এবং মানুষের আয়ও সেই দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়বে। কারণ মূল্যস্ফীতি কমা মানেই বাজার সস্তা হওয়া নয়; মানুষের জন্য আসল স্বস্তি তখনই, যখন দাম স্থির থাকে বা কমে এবং আয়ের সঙ্গে খরচের ব্যবধানও কমতে শুরু করে।

