বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভিসা। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে ভিসার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট স্টিফেন কারপিন বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দেশে একটি প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র বা গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টার স্থাপনের জন্য ভিসাকে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের দৃষ্টিতে এমন উদ্যোগ শুধু ডিজিটাল লেনদেন বাড়াবে না, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ভিসার বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত শাধিন জানান, বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ভিসার মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র বা গ্লোবাল সার্ভিস সেন্টার স্থাপন করা গেলে সরাসরি চাকরির পাশাপাশি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি সেবা ও দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে ডিজিটাল পেমেন্ট। দেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের সবাই কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহার করেন না। ভিসা এই গ্রাহকদের আরও বেশি করে কার্ডভিত্তিক ও ডিজিটাল লেনদেনে যুক্ত করতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে। এর ফলে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি লেনদেনের হিসাব আরও সহজে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ব্যবসার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে বিক্রয়, আয় ও অর্থপ্রবাহের তথ্য সংরক্ষণ সহজ হয়, যা ভবিষ্যতে ঋণপ্রাপ্তি ও আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে ব্যবসার অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের বিদেশ থেকে আয় দেশে আনার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে আয় করছেন। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে পাওয়া অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে পেমেন্ট পদ্ধতি, সময় ও খরচ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা থাকে। এ কারণে ভিসার সঙ্গে একটি কার্যকর ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে ফ্রিল্যান্সাররা তাদের বৈদেশিক আয় নিরাপদ ও সহজ উপায়ে দেশে আনতে পারেন। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল সেবা রপ্তানির সম্ভাবনাও আরও বাড়তে পারে।
ভিসার আগ্রহ শুধু কার্ড বা প্রচলিত ডিজিটাল পেমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, সহজ ও দ্রুত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাও দেখছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে প্রতারণা, সন্দেহজনক লেনদেন ও সাইবার ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রয়োজনও বাড়ছে। এআই ব্যবহার করে লেনদেনের অস্বাভাবিক ধরন দ্রুত শনাক্ত করা গেলে আর্থিক প্রতারণা ঠেকানো এবং গ্রাহকের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত পেমেন্ট অনুমোদন, গ্রাহকসেবা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাতেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন সহজ করার ক্ষেত্রেও ভিসার প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে মেট্রোরেল, টোল প্লাজা ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো সরকারি ও জনসেবামূলক ব্যবস্থায় ভিসা কার্ডের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। এসব সেবায় সরাসরি কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ বাড়লে টিকিট বা ফি পরিশোধের সময় কমতে পারে এবং নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনও কমবে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে শুধু কার্ড গ্রহণের সুযোগ তৈরি করলেই হবে না; নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট অবকাঠামো, দ্রুত লেনদেন, তথ্য নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির আরেকটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে সৃজনশীল অর্থনীতিতেও কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে ভিসা। প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা ও সৃজনশীল খাতের বিস্তার হলে দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসাগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে আরও সহজে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের আগ্রহকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ দিতে বাংলাদেশের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজও রয়েছে। ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীদেরও সহজ ও কম খরচের সেবা দিতে হবে। ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ এলেই ডিজিটাল অর্থনীতি বড় হবে না; স্থানীয় দক্ষ জনশক্তি, অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে ভিসার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। এখন এই আগ্রহ কতটা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয় এবং প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র, ডিজিটাল পেমেন্ট, এআই ও ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়। বাংলাদেশ যদি এসব উদ্যোগকে শুধু কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, সেবা রপ্তানি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে ভিসার বিনিয়োগ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য আরও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

