বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার মার্কিন বিনিয়োগ আনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (আমচ্যাম)। তবে এই বিনিয়োগ বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, সরকারি অনুমোদন সহজ করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে আমচ্যামের প্রতিনিধিদল এসব বিষয়ে আলোচনা করে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।
আমচ্যামের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে নিজেদের আগ্রহের কথা জানায়। সংগঠনটি বলেছে, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে বাংলাদেশে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে দেশের মোট কর রাজস্বের ২০ শতাংশের বেশি দিয়েছে বলেও আমচ্যামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এবার বিদ্যমান সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি নতুন মার্কিন কোম্পানিকে বাংলাদেশে আনতে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের উদ্যোগে সহায়তা করতে চায় তারা।
তবে এই অর্থ বাংলাদেশে আসবে কি না, সেটি শুধু বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর নির্ভর করবে না। ব্যবসা শুরু করতে কত সময় লাগে, অনুমোদন পেতে কতগুলো দপ্তরে যেতে হয়, কর ও শুল্কনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন হয় কি না এবং বিনিয়োগ করা অর্থ বা মুনাফা প্রয়োজনের সময় দেশে থেকে বাইরে নেওয়া কতটা সহজ এসব বিষয়ও বিদেশি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। এ কারণেই আমচ্যাম নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, দক্ষ প্রশাসন এবং সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত আলোচনাকে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকার পাশাপাশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগও কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, নিয়ন্ত্রক জটিলতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চয়তা বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন মার্কিন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আনার বিষয় নয়; এটি বাস্তবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে পারলে অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আমচ্যাম সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলোর মধ্যে সময়সীমা বেঁধে অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা, একক জানালা বা সিঙ্গেল-উইন্ডো পদ্ধতি, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর, শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগ করা মূলধন ও মুনাফা দেশে আনা নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ী সংগঠনটির বক্তব্য হলো, শুধু সংস্কারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নই বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি করবে। একটি কারখানা বা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগকারী সাধারণত কয়েক বছর ধরে অর্থ আটকে রাখেন। তাই আজকের নিয়ম আগামী বছরও মোটামুটি একই থাকবে কি না, সেটি তার বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মার্কিন বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১.৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করেছে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৭.১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইতোমধ্যে বড়; এখন বিনিয়োগ বাড়লে সেই সম্পর্ক শুধু পণ্য কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎপাদন ও প্রযুক্তিভিত্তিক অংশীদারত্বেও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো তৈরি হওয়ায় এই সম্পর্কের আরেকটি নতুন দিক তৈরি হয়েছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কহার রাখার কথা জানিয়েছে এবং কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য শূন্য শুল্কের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য বাজারসুবিধা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দুই ক্ষেত্রেই এখন ব্যবসায়িক সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আমচ্যাম বৈঠকে শুধু প্রচলিত শিল্পে বিনিয়োগ নয়, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক উৎপাদন এবং আর্থিক খাত আধুনিকায়নের মতো খাতেও সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। সংগঠনটি ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে একটি পরামর্শক ফোরাম এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিযোগিতা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান এবং নতুন নীতির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমচ্যামের সহযোগিতাকে স্বাগত জানিয়ে চলমান সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। এখন মূল বিষয় হবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। কারণ ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা নিজেই অর্থনীতিতে অর্থ যোগ করে না; প্রকল্প বাস্তবায়ন, কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন শুরু হলেই এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের জন্য তাই আমচ্যামের ৫ বিলিয়ন ডলারের আগ্রহকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখার পাশাপাশি এটিকে বিনিয়োগ পরিবেশের পরীক্ষাও বলা যায়। নীতি যদি স্থিতিশীল থাকে, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় জটিলতা কমে এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার মতো নিশ্চয়তা পান, তাহলে এই প্রতিশ্রুতির একটি অংশ বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নিতে পারে। আর সেই বিনিয়োগ যদি উৎপাদন, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী শিল্পে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নতুন কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

