দেশের নৌপথ ও নৌযানের প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে নৌযান শুমারি করতে যাচ্ছে সরকার। এই শুমারিতে তথ্য সংগ্রহের সময় কোনো ধরনের অসঙ্গতি, অনিয়ম বা তথ্য বিকৃতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে (বিবিএস) শুমারির মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তিনি এ কথা বলেন। আগামী ২০ থেকে ২৯ আগস্ট সারা দেশে এই শুমারি পরিচালিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির ভিত্তি হলো নির্ভরযোগ্য তথ্য। কোনো খাতে কতটি প্রতিষ্ঠান, সম্পদ বা যানবাহন রয়েছে তার সঠিক হিসাব না থাকলে সেই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিনিয়োগ কিংবা সরকারি সহায়তার পরিকল্পনাও যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না। এ কারণে নৌযান শুমারিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহে কোনো অসঙ্গতি বা কারচুপি ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
এই শুমারির গুরুত্ব শুধু দেশে কতটি নৌযান চলছে, সেই সংখ্যা জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকার জানতে চায় দেশের বিভিন্ন নদীপথে কী ধরনের নৌযান চলাচল করছে, সেগুলোর ব্যবহার কী, মালিকানা কার হাতে এবং কোথায় কতটা নৌযান কার্যক্রম রয়েছে। এসব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া গেলে নৌপরিবহন খাতের প্রকৃত আকার সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য ধারণা তৈরি হবে। বর্তমানে নৌযান নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা বা খাতভিত্তিক তথ্য থাকলেও একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চিত্র তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতের নীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা আরও বাস্তবভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নৌপথের গুরুত্বও এখানেই। নদীমাতৃক এই দেশে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নৌপথ তুলনামূলকভাবে কম খরচের মাধ্যম হতে পারে। বিশেষ করে ভারী ও বড় আকারের পণ্য দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনে নদীপথ ব্যবহার বাড়ানো গেলে সড়কনির্ভরতার চাপ কমানো সম্ভব। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীও নৌপথকে পণ্য পরিবহনের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে এর কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নৌপথের সঠিক ব্যবহার বাড়াতে পারলে দেশের বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও গতি আসতে পারে।
এর সঙ্গে সড়কপথের ওপর বাড়তে থাকা চাপের বিষয়টিও যুক্ত। দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়কের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যানজট, পরিবহন ব্যয় ও সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়ানো গেলে একই সঙ্গে সড়কের ওপর চাপ কমানো এবং পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করা সম্ভব হতে পারে। নৌযান শুমারির মাধ্যমে কোন ধরনের নৌযান কোথায় বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কোথায় নৌপরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব আহসানও দেশের নদী, বাণিজ্য ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে নৌপরিবহনের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দেশের নৌপথের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। নৌপথের ব্যবহার বাড়িয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন ও পর্যটনেও নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এ লক্ষ্যেই সরকার নৌপথকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
নৌযান শুমারি পরিচালনা করবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, আর এতে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ২০ থেকে ২৯ আগস্টের এই কর্মসূচিতে সারা দেশের নৌযানের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, শুমারির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ভবিষ্যতে নৌযান ব্যবস্থাপনা, নৌপথ উন্নয়ন, নিরাপদ নৌ চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট খাতে নীতিনির্ধারণে কাজে লাগবে। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কী ধরনের নৌপরিবহন অবকাঠামো প্রয়োজন, সেটিও নির্ধারণে এই তথ্য সহায়ক হতে পারে।
তবে শুমারির ফল কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে তথ্য কতটা সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে তার ওপর। নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা কম বা বেশি দেখানো হলে পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া নীতিও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলবে না। কোথাও নৌযান বেশি থাকলেও তথ্য কম এলে সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ পিছিয়ে যেতে পারে। আবার প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে বেশি তথ্য এলে সরকারি অর্থ ও সম্পদের ভুল জায়গায় ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই শুধু শুমারি পরিচালনা নয়, সংগৃহীত তথ্য যাচাই ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নৌপথকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে না দেখে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথম প্রয়োজন সঠিক তথ্য। কোন নৌযান কোথায় চলছে, কত পুরোনো, কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং মালিকানা কাঠামো কী এসব তথ্য সামনে এলে নৌপরিবহন খাতের দুর্বলতা ও সম্ভাবনা দুটিই স্পষ্ট হবে। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে নৌপথ উন্নয়ন, নিরাপত্তা, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে। ফলে আসন্ন নৌযান শুমারি শুধু একটি পরিসংখ্যান সংগ্রহের কর্মসূচি নয়; দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও পরিকল্পিত ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

