দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা দেশের অর্থনীতিতে জুলাই মাসে কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৩২ শতাংশে।
এটি গত আট মাসের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন সাধারণ মূল্যস্ফীতি। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। এরপর থেকে জুলাই মাসের ৮.৩২ শতাংশই সর্বনিম্ন হার।
মূল্যস্ফীতির এই পতনকে অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার বাড়তি দামের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল। জুলাইয়ের পরিসংখ্যান অন্তত দেখাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে সেই মূল্যচাপ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.১৬ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে তা কমে হয়েছে ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ জুনের তুলনায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে ০.৮৪ শতাংশ।
এক বছরের হিসাবেও কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৫৫ শতাংশ। সেই তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ের হার কিছুটা কম।
তবে মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া মানেই পণ্যের দাম আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের জন্য চাপের কারণ হতে পারে, যদিও সেই চাপের বৃদ্ধির হার কমেছে।
জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে খাদ্যপণ্যের দাম। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭.১৬ শতাংশে নেমেছে।
জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এই খাতে মূল্যস্ফীতি কমেছে ১.৪৪ শতাংশ।
এটি শুধু এক মাসের তুলনায় বড় পতন নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৩৬ শতাংশ। এরপর জুলাইয়ের ৭.১৬ শতাংশই এই খাতে সর্বনিম্ন হার।
গত বছরের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানেও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে আসার বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের বড় একটি অংশ খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পেছনে চলে যায়। ফলে এই খাতে মূল্যচাপ কমলে মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রায় তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখা দিতে পারে।
শুধু খাদ্যপণ্য নয়, খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।
জুন মাসে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.৬১ শতাংশ। জুলাই মাসে তা কমে হয়েছে ৯.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এই খাতেও মূল্যস্ফীতি কমেছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৩৮ শতাংশ। চলতি বছরের জুলাইয়ের হার তার তুলনায় কিছুটা কম হলেও এখনো এটি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের ৯.২৮ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ৯.০৯ শতাংশের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ এই খাতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমেছে ঠিকই, কিন্তু তা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি।
মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, মানুষের আয় যদি একই থাকে কিন্তু পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার গতি কমে, তাহলে পরিবারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.১৬ শতাংশে নেমে আসা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে এখানেই পুরো স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাসস্থান, পোশাক, পরিবহন, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য সেবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে মূল্যচাপ এখনো যথেষ্ট রয়েছে।
তাই জুলাইয়ের পরিসংখ্যানকে মূল্যস্ফীতির সমস্যা পুরোপুরি সমাধানের চেয়ে বরং মূল্যচাপ কমে আসার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় স্বস্তিদায়ক। বিশেষ করে জুনের ৯.১৬ শতাংশ থেকে এক লাফে ৮.৩২ শতাংশে নামা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির গতি কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে এই প্রবণতা আগামী মাসগুলোতেও বজায় থাকে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। খাদ্যপণ্যের বাজার, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি যেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, সেখানে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় অর্থনীতিতে মূল্যচাপ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে সাম্প্রতিক পতনকে স্থায়ী প্রবণতায় পরিণত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে জুলাইয়ের ৮.৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন এই হার বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যচাপ কমে আসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তা সাধারণ মানুষের জন্যও আশাব্যঞ্জক। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই নিম্নমুখী প্রবণতা ধরে রাখা এবং একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার উচ্চ মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা।

