দশ বছর আগে ১২ জেলায় হাই-টেক পার্ক নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবায়নের ধীরগতিতে সেটি এখন আট জেলায় সীমিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও সিলেট—এই চার জেলা প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও ব্যয় কমছে না। বরং নতুন করে ৮৮৩ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০১৭ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের আওতায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ ছিল ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের অংশ ২৫২ কোটি টাকা। এখন সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু এক দশক পরও সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ৪০ শতাংশ। চারটি জেলায় কাজের অগ্রগতি ১ শতাংশেরও কম হওয়ায় সেগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চার জেলা বাদ, তবু খরচ কমছে না
চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও সিলেটের প্রকল্প কার্যক্রম প্রায় এগোয়নি। এসব এলাকায় এ পর্যন্ত ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।
২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় ঋণচুক্তি পর্যালোচনা সভাতেও চার জেলা বাদ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি হয়। একই বৈঠকে নাটোরের সিংড়ায় সাততলার পরিবর্তে চারতলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে প্রকল্পের পরিধি কমলেও বাকি কাজ শেষ করতে আরও ৮৮৩ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে সংশোধিত প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যয় বাড়ানোর বড় কারণ শুল্ক-ভ্যাট
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে নির্মাণসামগ্রী আমদানিতে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রীর ৬৫ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করার কথা। এসব সামগ্রীর শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। কিন্তু মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এ খাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থ রাখা হয়েছিল।
এখন সেই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ সরকারের অংশ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া আটটি স্থানে আনসার ব্যারাক, বিভিন্ন স্থানে পয়োনিষ্কাশন শোধনাগার ও ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক নির্মাণসহ নতুন কিছু কাজ যুক্ত করা হয়েছে। কিছু স্থানে সীমানাপ্রাচীর, বিদ্যুতায়ন এবং প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থারও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
শুরু থেকেই ছিল বাস্তবায়ন জটিলতা
প্রকল্পে এখন পর্যন্ত মোট সাতজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প তৈরির সময় সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করের প্রয়োজনীয় অর্থ যথাযথভাবে হিসাব করা হয়নি।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন বিস্তারিত হিসাব-নিকাশের পর এসব খাতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন হলে বাকি কাজ পূর্ণ গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এক দশকের প্রকল্পে নিরীক্ষার দাবি
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি। তাঁর মতে, প্রকল্পে এখন পর্যন্ত যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি না—তা জানতে বিস্তারিত নিরীক্ষা করা দরকার।
১২ জেলা নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি এখন আট জেলায় সীমিত হচ্ছে। অথচ এক দশকে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ এবং ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রকল্পের পরিধি কমার পরও কেন অতিরিক্ত ৮৮৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

