বাংলাদেশের অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে বদলে এপ্রিল-মার্চ করার পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট উইং এখন এ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রশাসনিক সংস্কার পর্যালোচনা করছে। প্রস্তাবটি পরবর্তী ধাপে মন্ত্রিসভা কমিটির সামনে তোলার কথা রয়েছে।
বর্তমানে দেশের অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় ৩০ জুন। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থবছর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন অর্থবছরের শেষ তিন মাস বর্ষাকালের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় অবকাঠামোর মতো অনেক প্রকল্পে কাজের গতি কমে যায়। আবার অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দের টাকা খরচ দেখানোর চাপ তৈরি হলে শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে কাজ করার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে। অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা গেলে বছরের শেষ তিন মাস জানুয়ারি-মার্চে পড়বে, অর্থাৎ বড় নির্মাণকাজের জন্য তুলনামূলক অনুকূল সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অর্থবছরের তিন মাস এগিয়ে আনা মানে শুধু বাজেটের ক্যালেন্ডার বদলে দেওয়া নয়। এর সঙ্গে আয়কর, ভ্যাট, রাজস্ব হিসাব, সরকারি হিসাবরক্ষণ, বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়, সরকারি সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনাও নতুন সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। এমনকি চলমান প্রকল্পগুলোর কাজের সময় ও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। অতীতে অর্থবছর পরিবর্তনের আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি; এবারও সফলতার বড় শর্ত হবে পরিবর্তনের জন্য একটি পরিষ্কার রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরি করা।
পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জুন মাসে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ। অতীতে দেখা গেছে, অর্থবছরের শেষ দিকে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় দ্রুত বাড়ে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রথম ১১ মাসে এডিপির যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছিল, শুধু জুন মাসেই তার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় হয়েছিল। একই ধরনের প্রবণতা পরবর্তী সময়েও আলোচনায় এসেছে। ফলে অর্থবছরের শেষ সময়টি যদি বর্ষাকালের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক সময়সূচি ও অর্থবছর শেষ করার চাপ দুইয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছর পরিবর্তনের যুক্তি থাকলেও এটিকে সরকারি প্রকল্পের অপচয় বন্ধের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়, ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত তদারকি প্রতিটি ধাপে দুর্বলতা থাকলে শুধু ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলানো যাবে না। তাই অর্থবছর পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থায়ও সংস্কার প্রয়োজন। এ কারণেই সরকার প্রকল্পের অগ্রগতি নজরদারিতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে বিভিন্ন প্রকল্পের অবস্থা রেড, ইয়েলো ও গ্রিন সংকেতের মাধ্যমে দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন অর্থবছর চালু করতে হলে পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার মধ্যে একটি রূপান্তরকালও প্রয়োজন হবে। কারণ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ইতোমধ্যে ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে এবং বর্তমান কাঠামোতেই বাজেটটি তৈরি করা হয়েছে। ফলে এখন অর্থবছর পরিবর্তন করতে চাইলে কোন সময়ের হিসাব কীভাবে বন্ধ হবে, মধ্যবর্তী সময়ের বাজেট কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কর ও সরকারি হিসাব কোন সময়সীমা অনুসরণ করবে এসব প্রশ্নের সমাধান করতে হবে।
সবশেষে বিষয়টি শুধু সরকারি হিসাবের সময় পরিবর্তনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা। অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে বর্ষার আগে বড় প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য বেশি সময় পাওয়া যেতে পারে, জুনের শেষ মুহূর্তে টাকা খরচের চাপও কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে অর্থবছরের সঙ্গে প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্র, অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াটিকেও নতুন সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ ক্যালেন্ডার বদলানো সহজ অংশ; সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সরকারি অর্থ ব্যবহারের সংস্কৃতি বদলানোই হবে আসল পরীক্ষা।

