বাংলাদেশের নদীগুলোর বালুতে থাকা খনিজ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। দেশের আটটি প্রধান নদীব্যবস্থায় চালানো জরিপে এ সম্ভাবনার প্রাথমিক ভিত্তিও পাওয়া গেছে।
৫ হাজার ৪৮১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত এই জরিপে সংগ্রহ করা হয়েছে ৬ হাজার ৬০০টির বেশি বালুর নমুনা। এর মধ্যে ৮০০টির বেশি নমুনার খনিজ, রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নদীর বালুতে কোয়ার্টজসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ রয়েছে। এসব বালু থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সরাসরি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার বিশুদ্ধতা অর্জন করতে আরও উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণাগার ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা দরকার।
জরিপের আওতায় ছিল ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা, তিস্তা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, মেঘনার উচ্চ ও নিম্ন অববাহিকা এবং ফেনী-মুহুরী নদীব্যবস্থা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রধান নদীগুলোতে ৩০০ বিলিয়ন টনেরও বেশি বালু রয়েছে। এসব বালুর স্তর পাঁচ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত পুরু। এ ছাড়া হিমালয় থেকে প্রতিবছর নদীগুলোর মাধ্যমে আনুমানিক ১ থেকে ১.৫ বিলিয়ন টন নতুন বালু দেশে এসে জমা হয়।
নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংগৃহীত বালুর প্রায় ৯৪ শতাংশই বালুকণা। এর হালকা খনিজ অংশে কোয়ার্টজের পরিমাণ প্রায় ৮৮.৭ শতাংশ। পাশাপাশি বালুতে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভারী খনিজ রয়েছে। এর মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, গারনেট ও রুটাইল উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ভূতত্ত্ববিদ ড. মো. সোহেল রানার গবেষণায় দেখা গেছে, ভাসমান পৃথকীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে নদীর বালু থেকে ৯৯.৫ শতাংশ বিশুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদন করা সম্ভব।
এই মাত্রার বিশুদ্ধতা কাচশিল্পের জন্য উপযোগী হলেও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রয়োজন আরও বেশি বিশুদ্ধতা। চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজন ৯৯.৯৯ শতাংশ থেকে ৯৯.৯৯৭ শতাংশ বিশুদ্ধতার অতি বিশুদ্ধ কোয়ার্টজ। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে উন্নত খনিজ প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম মাত্রার অমিশ্রণ শনাক্ত করার সক্ষমতা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, তাই এখনই বিপুল অর্থ ব্যয়ে ওয়েফার বা চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনে যাওয়ার চেয়ে ধাপে ধাপে এগোনো বেশি বাস্তবসম্মত। প্রথম দিকে উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা, বিশেষায়িত কাচ, অপটিক্যাল ফাইবার ও সমন্বিত বর্তনী নকশার মতো খাতে সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত পাঁচ ধাপে একটি জাতীয় রোডম্যাপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের নদীগুলোর বালুতে থাকা খনিজ সম্পদের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরির পাশাপাশি একটি বিশেষায়িত বালু প্রক্রিয়াকরণ ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ২০৩১ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে ৫ হাজার টনের বেশি উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। একই সময়ে সমন্বিত বর্তনী নকশার পরিবেশ বা কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
শেষ দুই ধাপে ২০৪১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক পর্যায়ে ওয়েফার উৎপাদন কিংবা চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উন্নত খনিজ প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামোর ঘাটতি, দক্ষ জনবলের অভাব, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন—সবই বাংলাদেশের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই নদীর বালুতে থাকা খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সরাসরি চিপ উৎপাদনে যাওয়ার আগে নদীর বালু থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। এভাবে ধাপে ধাপে এগোতে পারলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ভবিষ্যতে উচ্চ প্রযুক্তির শিল্পের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

