বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংকিং, পরিবহন, বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ নানা ধরনের সেবা এখন অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেবা খাতের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২.০৬ লাখ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরে যা ছিল ২৮.৭৫ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খাতটির আকার বেড়েছে প্রায় ৩.৩১ লাখ কোটি টাকা। তবে শুধু আকার বাড়লেই অর্থনীতির কাঠামোগত উন্নতি হচ্ছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই বড় হয়ে ওঠা সেবা খাত কতটা উৎপাদনশীল, কতটা উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে কতটা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।
গত কয়েক বছরের দিকে তাকালেই পরিবর্তনের মাত্রাটা বোঝা যায়। ২০২০-২১ অর্থবছরে সেবা খাতের আকার ছিল প্রায় ১৮.১১ লাখ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে হয় ২০.২৭ লাখ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২২.৯৫ লাখ কোটি, ২০২৩-২৪-এ ২৫.৭২ লাখ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৮.৭৫ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে খাতটির নামমাত্র আকার প্রায় ৭৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের নামমাত্র GDP বেড়ে প্রায় ৬১.২ লাখ কোটি টাকা বা ৫০১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ৫৫.১৫ লাখ কোটি টাকা বা ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। তবে মূল্যস্ফীতি ও দামের পরিবর্তনের প্রভাব নামমাত্র প্রবৃদ্ধির মধ্যে থাকে। তাই অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে শুধু টাকার অঙ্ক নয়, বাস্তব উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতার দিকটিও দেখতে হয়।
এখানেই বাংলাদেশের সেবা খাত নিয়ে আসল আলোচনাটি শুরু হয়। সেবা খাত বলতে শুধু ব্যাংক, বিমা বা মোবাইল ফোনের ব্যবসা বোঝায় না। পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, পরিবহন ও গুদামজাতকরণ, আবাসন, রিয়েল এস্টেট, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা, পেশাদার সেবা সবই এর অংশ। দেশের মানুষ যত বেশি শহরমুখী হচ্ছে, আয় ও ভোগের ধরন যত বদলাচ্ছে এবং ব্যবসা যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে, ততই এসব সেবার চাহিদা বাড়ছে। ফলে সেবা খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতির স্বাভাবিক পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। সাম্প্রতিক BBS হিসাবেও FY26-এ সেবা খাতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৪.৫৯ শতাংশে উঠেছে, আগের অর্থবছরের ৪.৩৫ শতাংশ থেকে যা কিছুটা বেশি। একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ২.৮৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতিতে দুর্বল শিল্প প্রবৃদ্ধির সময়েও সেবা খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, বড় সেবা খাত আর উন্নত সেবা খাত এক জিনিস নয়। একটি অর্থনীতি বড় হচ্ছে মানেই তার সেবা খাত উচ্চ উৎপাদনশীল হয়ে উঠছে না। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, ব্যক্তিগত সেবা বা ছোট আকারের অনানুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কম এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। ফলে আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সেবা খাতের আকার বাড়ানো নয়; বরং এমন সেবা তৈরি করা, যার মূল্য বেশি, উৎপাদনশীলতা বেশি এবং দেশের বাইরে বিক্রি করার সম্ভাবনাও রয়েছে। আর্থিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং, আধুনিক লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পেশাদার সেবা এবং পর্যটনের মতো খাত এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গায় বাংলাদেশের সামনে বড় একটি সুযোগও আছে। তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি আয় বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি কারখানা স্থাপন, কাঁচামাল সংগ্রহ, বিদ্যুৎ-গ্যাস, বন্দর ও পরিবহন সবকিছুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু কিছু ধরনের সেবা তুলনামূলকভাবে কম পুঁজি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে দেওয়া সম্ভব। একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী ঢাকা থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করতে পারেন, একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোম্পানির হিসাব বা গ্রাহকসেবা পরিচালনা করতে পারে, আবার একজন পেশাজীবী অনলাইনে বিদেশি ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করতে পারেন। অর্থাৎ সঠিক অবকাঠামো, দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে সেবা রপ্তানি বাংলাদেশের জন্য নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ তৈরি করতে পারে।
তবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে দক্ষতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেবা খাতের একটি বড় অংশে এখনো কম দক্ষতার শ্রমের ওপর নির্ভরতা বেশি। ভবিষ্যতের উচ্চমূল্যের সেবা অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন সফটওয়্যার, ডেটা বিশ্লেষণ, আর্থিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল বিপণন, হিসাবরক্ষণ, ভাষা, ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশল ও পেশাদার সেবায় দক্ষ জনবল। একই সঙ্গে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেই হবে না; কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা দ্রুত শেখার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও সেবা খাতের চাহিদার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম সহজ করা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই পরিবর্তনের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট করছে। FY26-এ দেশের প্রকৃত GDP প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশে ফিরলেও তা এখনো উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে নয়। বিনিয়োগ দুর্বল, মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে এবং শিল্প খাতও আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না। এ অবস্থায় সেবা খাত অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীলতা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর নির্ভর করে এর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সেবা কর্মকাণ্ডের স্থিতিশীল ভূমিকার কথা বলেছে, পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশ, আর্থিক খাতের সুশাসন, অবকাঠামো ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী ধাপটি হওয়া উচিত ‘বড় সেবা খাত’ থেকে ‘উৎপাদনশীল সেবা অর্থনীতি’তে যাওয়া। কত লাখ কোটি টাকার সেবা তৈরি হচ্ছে, সেই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতি কর্মীর উৎপাদন কত, কতগুলো ভালো চাকরি তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তি কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বিদেশি বাজারে বাংলাদেশ কতটা সেবা বিক্রি করতে পারছে। অর্থনীতির আকার ৫০১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে একটি বড় মাইলফলক। কিন্তু পরবর্তী সাফল্য নির্ভর করবে এই বড় অর্থনীতির ভেতরে কতটা উচ্চমূল্যের, দক্ষতাভিত্তিক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক সেবা খাত তৈরি করা যায় তার ওপর।

