বন্ধ হয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো ধাপে ধাপে আবার চালু করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান তৈরি এবং এসব কারখানাকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি সক্রিয় করাই এর লক্ষ্য। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. শামসুজ্জামান সুরুজ বলেছেন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বসিয়ে না রেখে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনে ফেরানোর কাজ চলছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু কারখানার চাকা ঘোরালেই হবে না, পুরোনো যন্ত্রপাতি, কম উৎপাদনশীলতা, আখের সরবরাহ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক লোকসানের সমস্যাও একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।
দেশে বিএসএফআইসির অধীনে মোট ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টির আখ মাড়াই কার্যক্রম ২০২০-২১ মৌসুম থেকে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ ছয়টি হলো পাবনা, শ্যামপুর, পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর ও কুষ্টিয়া চিনিকল। তবে সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, সব কটি কারখানাকে স্থায়ীভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি; বরং ধাপে ধাপে পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও চলতি বছরের মে মাসে জানিয়েছিলেন, ছয়টি বন্ধ চিনিকলের কয়েকটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে বন্ধ কারখানাগুলো আধুনিকায়ন ও পুনরায় চালুর বিষয়ে ২০২৪ সালে একটি ১১ সদস্যের টাস্কফোর্সও কাজ করেছে।
এই উদ্যোগের পেছনে শুধু চিনি উৎপাদনের হিসাব নেই, রয়েছে বড় একটি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রশ্ন। একটি চিনিকল চালু থাকলে শুধু কারখানার শ্রমিকরাই আয় করেন না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন আখচাষি, পরিবহনকর্মী, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানকারী। ফলে কোনো চিনিকল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব কারখানার সীমানা পেরিয়ে আশপাশের বাজার ও কৃষি অর্থনীতিতেও পড়ে। সরকারি হিসাবেও বিএসএফআইসির চিনিশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা যুক্ত। এ কারণেই সরকার এখন বন্ধ কারখানাগুলোকে কেবল লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে পুনর্গঠন করে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করার সুযোগ খুঁজছে।
তবে এখানেই বড় প্রশ্ন হলো, যে কারণে চিনিকলগুলো বন্ধ হয়েছিল, সেই কারণগুলো কি বদলেছে? বাস্তবতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে। বিএসএফআইসির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সম্মিলিত লোকসান ছিল ৫০৮ কোটি টাকার বেশি। এর আগের অর্থবছরে লোকসান ছিল ৫৫৬ কোটি টাকার বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছয়টি লোকসানি মিল বন্ধ করার পরও লোকসানের ধারাটি পুরোপুরি থামেনি। পুরোনো যন্ত্রপাতি, অতিরিক্ত জনবল এবং কম ফলনশীল আখের মতো সমস্যাগুলোকে এই দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান অবশ্য লোকসানের হিসাবকে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, ঋণের সুদ এবং বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও আর্থিক দায় অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। তিনি বলেছেন, এসব বিষয় বাদ দিলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচালনাগত লোকসান তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে সরকারের কাছেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে এখানেই সংস্কারের মূল জায়গা। একটি কারখানা চালু রাখার অর্থ শুধু কর্মীদের বেতন দেওয়া নয়; কাঁচামাল সংগ্রহ, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণের খরচ, উৎপাদন ব্যয় এবং উৎপাদিত চিনি বাজারজাত সব মিলিয়ে প্রতি কেজি চিনির প্রকৃত খরচ কত দাঁড়াচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত কারখানার টেকসই হওয়ার প্রশ্ন নির্ধারণ করবে।
সরকার তাই শুধু পুরোনো কাঠামোয় কারখানা চালু করার বদলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও নতুন ব্যবস্থাপনা মডেলের কথাও ভাবছে। সরকারি পর্যায়ে বন্ধ চিনিকলগুলোকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জুন মাসে শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, যেসব রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বর্তমান কাঠামোয় অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়, সেগুলোর কিছু জায়গায় শিল্পপার্ক গড়ে তোলার এবং ভবিষ্যতে চিনি উৎপাদনে আখের পাশাপাশি সুগার বিটের মতো বিকল্প কাঁচামাল ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের সামনে এখন দুটি পথ, পুরোনো কারখানাকে আধুনিক করে উৎপাদনে ফেরানো, অথবা যেখানে সেটি অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয় সেখানে সম্পদের নতুন ব্যবহার নিশ্চিত করা।
আখচাষিদের জন্যও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আখের দাম গত অর্থবছরে প্রতি কুইন্টাল ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২৫ টাকা করা হয়েছে এবং কৃষকদের জন্য প্রণোদনার পরিমাণ ৬ কোটি থেকে বাড়িয়ে ১১ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মোবারকগঞ্জ চিনিকলে আখের ওজন নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকের মোবাইল হিসাবে টাকা পাঠানোর একটি ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। এই ধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্ব কম নয়। কারণ সময়মতো আখের দাম না পাওয়া বা টাকা পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া কৃষকদের চিনিকলে আখ সরবরাহে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আর পর্যাপ্ত আখ ছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও একটি চিনিকল পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব নয়।
চিনিকল পুনরুজ্জীবনের আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে বিদ্যুৎ ও উপজাত পণ্যে। আখ থেকে চিনি উৎপাদনের পর যে ব্যাগাস বা আখের ছোবড়া পাওয়া যায়, তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিএসএফআইসিও ভবিষ্যতে ব্যাগাস ব্যবহার করে কো-জেনারেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনার কথা বলছে। একইভাবে চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি মোলাসেস, ইথানল, জৈব সারসহ অন্যান্য উপজাতকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি চিনিকলের আয়ের উৎস বাড়ানো সম্ভব। বিএসএফআইসির নিজস্ব নথিতেও বহু বছর ধরে উপজাতভিত্তিক পণ্য উৎপাদন ও কো-জেনারেশনের মাধ্যমে শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বন্ধ চিনিকল চালু করার সিদ্ধান্তকে যেন শুধু কর্মসংস্থান তৈরির প্রকল্প হিসেবে দেখা না হয়। অতীতে ছয়টি কারখানা বন্ধ করার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘদিনের লোকসান এবং আধুনিকায়নের প্রয়োজন। এখন একই যন্ত্রপাতি, একই উৎপাদন কাঠামো এবং একই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কারখানা চালু করা হলে কয়েক বছর পর আবারও একই জায়গায় ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তাই পুনরায় চালুর আগে প্রতিটি মিলের জন্য আলাদা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দরকার কত আখ পাওয়া যাবে, উৎপাদন ক্ষমতা কত, আধুনিকায়নে কত বিনিয়োগ লাগবে, প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ কত হবে, চিনি ছাড়াও কী কী পণ্য তৈরি করা যাবে এবং বাজারে সেগুলোর প্রতিযোগিতা কতটা। চলতি বছরের সরকারি বক্তব্যেও দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক পরিচালনা ও আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের চিনিশিল্পের সামনে তাই সুযোগ যেমন আছে, ঝুঁকিও কম নয়। বন্ধ কারখানার জমি, অবকাঠামো ও বিদ্যমান জনবল একদিকে বড় সম্পদ; অন্যদিকে এগুলোকে উৎপাদনশীল করতে বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকার যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করতে পারে, কৃষকের জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি করে, পুরোনো যন্ত্রপাতি বদলায় এবং চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য উপজাত পণ্যের ব্যবসা গড়ে তোলে, তাহলে বন্ধ চিনিকলগুলো নতুন অর্থনৈতিক ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু শুধু সরকারি অর্থ ঢেলে পুরোনো কাঠামো সচল করা হলে সেটি আবারও লোকসানের বোঝা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই ‘কারখানা খুলবে কি না’ নয়; কারখানা খুলে সেটিকে লাভজনক ও টেকসই ব্যবসায় পরিণত করা যাবে কি না সেটিই হবে সরকারের আসল পরীক্ষা।

