বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ করা গেলেও অর্থনীতির মূল সূচকগুলোতে এখনো তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি বলে মনে করছেন একজন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একজন সম্মানীয় ফেলো এই মূল্যায়ন দিয়ে বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি, নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে জড়তা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট—এসব সমস্যা এখনো কাটেনি। এর মধ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা।
তবে তাঁর মতে, সরকার যেসব ভালো উদ্যোগ ইতিমধ্যে নিয়েছে, তার সুফল বাস্তবে প্রতিফলিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড় করাতে তিনি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানি বাড়ানো এবং মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত মতামত দেন তিনি।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, সার্বিকভাবে সরকার বেশ কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে থাকা কিছু বিষয় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বাজেটেও বিনিয়োগবান্ধব বেশ কিছু রাজস্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেমন—বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার পরিধি বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন সহায়তা, ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং একক জানালা সেবা চালুর উদ্যোগ। এগুলোকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেন।
তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেন, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে যে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো পেয়েছে, সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেসরকারি খাতে ঋণের কম প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান তৈরিতে ধীরগতি এবং ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা—এসব এখনো অব্যাহত আছে।
ইতিবাচক উদ্যোগ সত্ত্বেও অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে বড় কোনো পরিবর্তন কেন দেখা যাচ্ছে না—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠার তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট বিনিয়োগের পথে নতুন একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ফলে সদিচ্ছা ও উদ্যোগ থাকলেও অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। তবে সরকারের নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর বাস্তব প্রভাব বুঝতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কী করা দরকার—এই প্রশ্নে তিনি সরাসরি বলেন, সবার আগে জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কোনো বিনিয়োগকারীই আগ্রহী হবেন না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নতুন কোনো কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়—এমন ঘোষণা দিলে বিনিয়োগকারীরা কেন এখানে বিনিয়োগ করতে আসবেন? তাই এই বাধা অবশ্যই দূর করতে হবে।
তিনি স্বীকার করেন, সরকার মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। একক জানালা সেবার মাধ্যমে একাধিক সুবিধা এক জায়গা থেকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কিছু সেবার জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আর জবাবদিহি নিশ্চিতেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দূর করাই মূল শর্ত। বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্মত বিদ্যুৎ ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জ্বালানি সংকট সমাধানে করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে আমদানির মাধ্যমে সংকট সামাল দিতে হবে। পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরও সক্রিয় করে স্থলভাগ, সমুদ্র উপকূল ও অগভীর সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিকল্পনাধীন নতুন ভাসমান জ্বালানি টার্মিনাল প্রকল্পগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার বলে তিনি মত দেন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এই দিকটিও অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় ইতিমধ্যে কিছু সংস্কার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি, পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা যেন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রয়োজনীয় সেবা পান, তাও নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে তিনি মন্তব্য করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দ্রুততর সরকারি সেবা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—এই সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলেই বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।

