একসময় যে জায়গায় দেশের অন্যতম বড় লোকসানি পাটকলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, দুই দশক পর সেই একই জমি এখন রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের বার্ষিক রপ্তানি এখন ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পোশাকের পাশাপাশি জুতা, স্বয়ংচালিত গাড়ির যন্ত্রাংশ ও বিশেষায়িত পোশাকের মতো তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, আদমজী ইপিজেডে বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ইপিজেডটি ২৯২ দশমিক ৬২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে। বেপজার বর্তমান হিসাবে এখানে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৮৪৩ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক, পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য, নিরাপত্তা জ্যাকেট, ব্লেজার, নিরাপত্তা জুতা, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক ও বৈদ্যুতিক পণ্য এবং গাড়ির আসনের কভার রয়েছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্যের বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর হলেও আদমজী ইপিজেডে ধীরে ধীরে এমন কিছু পণ্য তৈরি হচ্ছে, যেগুলোতে প্রযুক্তি, নকশা ও দক্ষতার ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। যেমন জাপানি প্রতিষ্ঠান টিএস টেক বাংলাদেশ গাড়ির আসনের কভার তৈরি করে জাপানের গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। আবার ইউক্রেনের বিনিয়োগে তৈরি নিরাপত্তা জুতা কারখানায় শিল্প ও বিশেষায়িত ব্যবহারের জুতা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ একই ইপিজেডে পোশাকের পাশাপাশি স্বয়ংচালিত শিল্প ও কারিগরি পণ্যের বাজারেও বাংলাদেশের প্রবেশ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষায়িত পোশাকের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিয়ের পোশাক ও সন্ধ্যাকালীন পোশাক তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ পোশাকের তুলনায় নকশা, অলংকরণ ও শেষ ধাপের কাজের ওপর বেশি নির্ভর করে। এসব পণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। শুরুতে এই ধরনের পণ্য তৈরির অভিজ্ঞ কর্মী দেশে পর্যাপ্ত না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে, উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্য তৈরি করতে শুধু কারখানা স্থাপন করলেই হয় না, শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের নতুন ধরনের দক্ষতাও তৈরি করতে হয়।
আদমজীর এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য শুধু একটি ইপিজেডের সাফল্যের গল্প নেই; এটি বাংলাদেশের শিল্পনীতির একটি বড় শিক্ষাও দেখায়। ২০০২ সালের ৩০ জুন ক্রমাগত লোকসানের পর আদমজী জুট মিল বন্ধ হয়ে যায়। বেপজাকে ওই এলাকার জমি ও সম্পদ দিয়ে নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের মার্চে আদমজী ইপিজেডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তখনকার লক্ষ্য ছিল পরিত্যক্ত শিল্পভূমিকে আবার উৎপাদন ও রপ্তানির কাজে ফিরিয়ে আনা। দুই দশকের ব্যবধানে সেই জায়গায় বহু দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এসে কারখানা গড়ে তুলেছেন।
এই রূপান্তরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু রপ্তানি আয় দিয়ে মাপলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। একটি ইপিজেডে নতুন কারখানা মানে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা ধরনের সহায়ক ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়া। আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাংলাদেশে বিশেষায়িত পণ্য তৈরি করেন, তখন স্থানীয় কর্মীদের নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়া, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একটি কারখানার প্রভাব অনেক সময় তার নিজস্ব কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
আদমজী ইপিজেডের অবস্থানও এর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার একটি বড় কারণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে অবস্থান এবং রাজধানীর কাছাকাছি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের জন্য যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থার সুবিধা তৈরি হয়েছে। বেপজার তথ্যেও ইপিজেডটির অবস্থান ও আধুনিক অবকাঠামোকে বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে ২৭৬টি শিল্প প্লট রয়েছে এই ২৯২ দশমিক ৬২ একরের এলাকায়।
তবে সামনে বড় প্রশ্ন হলো, আদমজীর এই সাফল্যকে কতটা আরও বড় করা যায়। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও বিদ্যমান জায়গার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নতুন কারখানা স্থাপন এবং উৎপাদন বাড়াতে হলে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও দক্ষ কর্মীর মতো বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বেশি কারখানা নয়, কোন ধরনের পণ্য তৈরি হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি যদি ভবিষ্যতে শুধু বেশি পোশাক বিক্রির ওপর নির্ভর না করে বেশি মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের দিকে যেতে চায়, তাহলে আদমজী ইপিজেডের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোকে সেই পরিবর্তনের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আদমজী জুট মিলের গল্প তাই শুধু একটি পুরোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। একই জমিতে এক সময় রাষ্ট্রায়ত্ত একটি বড় পাটকল লোকসানে পড়ে বন্ধ হয়েছে, আর পরে সেই জায়গাতেই বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে উঠেছে। ২০০৬ সালে যাত্রার সময় যে ইপিজেডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল, দুই দশক পর তার রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রবৃদ্ধিকে আরও উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা যাতে আদমজী শুধু বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির আরেকটি কেন্দ্র না হয়ে শিল্প বৈচিত্র্যকরণেরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

