মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বলা হয় যেকোনো অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই শ্রেণিই ভোগব্যয়ের মূল চালিকাশক্তি, শিক্ষিত কর্মশক্তির জোগানদাতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এই মেরুদণ্ডেই এখন ফাটল ধরছে—নীরবে, ধীরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে। দ্য ডেইলি স্টারের একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা নিছক কয়েকটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়—এটি একটি কাঠামোগত সংকটের প্রামাণ্য দলিল, যাকে অগ্রাহ্য করার আর সুযোগ নেই।
যে সংকট আর সাময়িক নয়
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতিকে দেখা হয়েছে একটি চক্রাকার, সাময়িক সমস্যা হিসেবে—কখনো বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, কখনো টাকার অবমূল্যায়ন, কখনো সরবরাহ ব্যবস্থার সাময়িক বিপর্যয়ের ফল হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মূল্যস্ফীতি এখন আর সাময়িক ধাক্কা নয়; এটি পরিণত হয়েছে অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘জেদি মূল্যস্ফীতি’-তে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি, যার প্রধান নিয়ামক জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক—গত ডিসেম্বরে যা ছিল প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ, তিন প্রান্তিকের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশে।
সংখ্যাগুলো বিমূর্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব খুবই বাস্তব ও ব্যক্তিগত। যখন একটি পরিবারের বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাশার চেয়ে হাজার টাকা বেশি আসে, যখন রান্নার গ্যাসের অভাবে ব্যয়বহুল বৈদ্যুতিক বিকল্পের ওপর নির্ভর করতে হয়, যখন বাজারে গিয়ে প্রতিবার নতুন করে হিসাব কষতে হয় কোন জিনিসটি বাদ দেওয়া যায়—তখন এই পরিসংখ্যান আর কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে লাখো পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতা।
আয়-ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ফারাক
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো, মানুষের আয় বৃদ্ধির হার কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এই এক শতাংশ বিন্দুর ফারাক শুনতে সামান্য মনে হলেও, বছরের পর বছর জমতে থাকা এই ঘাটতিই একটি পরিবারের সঞ্চয়কে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। এর অর্থ দাঁড়ায়—যাদের বেতন কাগজে-কলমে বেড়েছে, বাস্তবে তারাও দরিদ্রতর হচ্ছেন।
এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় শিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আর তার একটি কাঠামোগত কারণ আছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের ভর্তুকিনির্ভর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে; ধনী শ্রেণির জন্য মূল্যস্ফীতি নিছক অস্বস্তির বিষয়, বিপর্যয়ের নয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পড়ে আছে এক নীতিগত শূন্যস্থানে—তাদের আয় সরকারি সহায়তা পাওয়ার মতো যথেষ্ট কম নয়, আবার ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর মতো যথেষ্ট বেশিও নয়। এই শ্রেণির প্রশ্ন তাই আর ‘এটা কেনা সম্ভব কি না’ নয়, বরং ‘সঞ্চয় বা অন্য প্রয়োজনীয় খরচে হাত না দিয়ে এটা কীভাবে কেনা যায়’।
কেন এটি শুধু পারিবারিক বাজেটের সমস্যা নয়
এই সংকটকে যদি শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বড় ভুল হবে। অর্থনীতিবিদরা যেমন সতর্ক করছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই চাপ মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানকে স্থায়ীভাবে নিচে নামিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। আজ যে পরিবার সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে, আগামীকাল সেই পরিবারই হয়তো সন্তানের শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবায় আপস করতে বাধ্য হবে। আর এই ধরনের ক্ষতি—মানবসম্পদের ক্ষয়—সহজে পূরণযোগ্য নয়; এর প্রভাব পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
এর একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক দিকও আছে। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেলে ভোক্তা চাহিদা কমে, চাহিদা কমলে বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়, কারখানাগুলো উৎপাদন সংকুচিত করতে বাধ্য হয়, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতায়। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের এই সংকট শুধু মধ্যবিত্তের সমস্যা নয়—এটি গোটা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি-চক্রকে স্তিমিত করে দেওয়ার একটি নীরব হুমকি।
নীতিনির্ধারণে প্রয়োজন দিক পরিবর্তন
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রচলিত ধারণা হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র হাতিয়ার কঠোর মুদ্রানীতি—সুদহার বাড়ানো, অর্থের জোগান সীমিত করা। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশের পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমান সংকট মূলত চাহিদাজনিত নয়; এটি সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিতরণ কাঠামোর ত্রুটি থেকে উদ্ভূত। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি শুধু চাহিদা সংকোচনের নীতি নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত উৎসের কোনো সমাধান তো হবেই না, উল্টো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়—রোগের চিকিৎসা না করে রোগীকে আরও দুর্বল করে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তাই সময় এসেছে নীতিনির্ধারণী মনোযোগ সরবরাহ শৃঙ্খলের দিকে ঘোরানোর। জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বাজারে অস্বাভাবিক মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যপণ্যের বিতরণ কাঠামোয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকি জোরদার করা—এসবই এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রয়োজন মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক লক্ষ্যভিত্তিক নীতি ভাবনা, যা এই শ্রেণিকে সরাসরি ভর্তুকির আওতায় না এনেও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে—যেমন জ্বালানি ও পরিবহন খাতে সুনির্দিষ্ট মূল্যনীতি পুনর্বিবেচনা, কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বাধাগুলো চিহ্নিত করে দূর করা।
সংখ্যার আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা হলো—একটি জাতির মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন প্রতি মাসে সঞ্চয়ের বদলে ঘাটতির হিসাব কষতে বাধ্য হয়, তখন সেটি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। মধ্যবিত্তের এই নীরব ক্ষয় রোধ করা এখন আর ঐচ্ছিক নীতি-বিবেচনার বিষয় নয়, বরং জরুরি করণীয়। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, পরিসংখ্যানের ঘরে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমানো দিয়ে প্রকৃত স্বস্তি ফিরবে না—যতক্ষণ না আয় ও ব্যয়ের মধ্যেকার এই ক্রমবর্ধমান ফারাক দূর করার সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দেরি যত বাড়বে, এই ক্ষয়ের মূল্য ততই বহুগুণ হয়ে ফিরে আসবে।

