বাংলাদেশের নতুন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল চালু করেছে সরকার। দেশের স্টার্টআপ খাতে স্থানীয় বিনিয়োগের ঘাটতি কমানো, বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন সরকারি উদ্যোগ মূলধন বিনিয়োগ ও তহবিল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপ বাংলাদেশ এই তহবিল চালু করেছে। ঢাকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি টাওয়ারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নতুন এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন তহবিলের মাধ্যমে শুধু স্টার্টআপগুলোতে সরাসরি অর্থায়ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উদ্যোগ মূলধনভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাকেও আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই স্টার্টআপ অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা থাকবে।
গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। তবে এই বিনিয়োগের বড় অংশই এসেছে বিদেশি উৎস থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশ মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের উদ্যোক্তারা বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারলেও দেশের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এখনো সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
নতুন তহবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এখানেই। সরকার মনে করছে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় করা গেলে স্টার্টআপ খাতের অর্থায়নের ভিত্তি অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব হবে।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হাই জানান, নতুন তহবিলের অর্থ নির্বাচিত দেশি ও বিদেশি উদ্যোগ মূলধন তহবিলে বিনিয়োগ করা হবে। যেসব তহবিলের পরিচালনা ব্যবস্থা শক্তিশালী, পেশাদার ব্যবস্থাপনা রয়েছে এবং সুস্পষ্ট বিনিয়োগ কৌশল রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এরই মধ্যে উপযুক্ত উদ্যোগ মূলধন তহবিল ব্যবস্থাপকদের বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আগ্রহী তহবিল ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে প্রাথমিক আগ্রহপত্র আহ্বানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তহবিলটির কাঠামো শুধু অর্থ বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই। কোন ধরনের তহবিলে অর্থ দেওয়া হবে, তহবিল ব্যবস্থাপক কীভাবে নির্বাচিত হবেন, যৌথ বিনিয়োগ কীভাবে হবে এবং এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব তৈরি করা সম্ভব—এসব বিষয়ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ বলেন, দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার ক্ষেত্রে উদ্যোগ মূলধন ও স্টার্টআপ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, শুধু অর্থ দিলেই একটি নতুন উদ্যোগ সফল হয় না। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অভিজ্ঞ পরামর্শ, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন কোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে অর্থের অভাব যেমন বড় বাধা, তেমনি অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবও অনেক উদ্যোগকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারে। ফলে নতুন তহবিল কার্যকর করতে হলে অর্থায়নের পাশাপাশি এসব সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বৈধ মুনাফা ও মূলধন নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও আস্থাশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, দেশে মেধাবী উদ্যোক্তা ও নতুন ধারণার অভাব নেই। সমস্যা অনেক ক্ষেত্রে অর্থায়নের সুযোগে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সম্ভাবনাময় কোনো উদ্যোগ কেবল অর্থের অভাবে থেমে যাবে না।
তবে নতুন তহবিলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। সরকারি উদ্যোগে তহবিল তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্টার্টআপ খাতকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করে একটি শক্তিশালী উদ্যোগ মূলধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
স্টার্টআপ বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ৩৬টি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি খাতকেও এই খাতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা যেমন উদ্যোক্তাদের সংখ্যা ও নতুন ধারণায়, তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অর্থায়নের ধারাবাহিকতায়। কোনো উদ্যোগ শুরু করার জন্য অর্থ পাওয়া গেলেও পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বাজারে প্রবেশ কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার মতো পর্যাপ্ত মূলধন অনেক সময় পাওয়া যায় না।
নতুন তহবিল সেই সমস্যার একটি অংশ সমাধান করতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন উদ্যোগ মূলধন তহবিলে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি হলে এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যও রয়েছে। স্থানীয় বাজারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বিনিয়োগই আকর্ষণ করবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
স্টার্টআপ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া বলেন, উদ্যোগ মূলধন ও উদ্ভাবনের বিকাশের জন্য সরকার একটি কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়। তাঁর মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন তহবিল শুধু স্টার্টআপে বিনিয়োগ বাড়াবে না, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ অবকাঠামোও তৈরি করবে।
তবে ৪০০ কোটি টাকার এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিনিয়োগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, তহবিল ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, প্রকৃত সম্ভাবনাময় উদ্যোগ চিহ্নিত করা এবং বিনিয়োগের পর উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে বড় তহবিলও প্রত্যাশিত ফল দিতে নাও পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে পোশাক, প্রবাসী আয় ও প্রচলিত শিল্প খাতের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। এর বাইরে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও নতুন ব্যবসাকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে শক্তিশালী বিনিয়োগ কাঠামো প্রয়োজন। সেই কাঠামো তৈরির পথে ৪০০ কোটি টাকার এই তহবিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—এই অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। কারণ তহবিল তৈরি করা প্রথম ধাপ; প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতগুলো উদ্যোগকে টেকসই ব্যবসায় পরিণত করা যায়, কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং কতটা দেশি-বিদেশি বেসরকারি মূলধন এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় তার ওপর।

