বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে এখন শুধু উৎপাদন খরচ কমানো বা রপ্তানি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নেই। জ্বালানি সংকট, বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশগত শর্ত কঠোর হয়ে ওঠায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পোশাক কারখানাগুলোকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির দিকে যেতে হবে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ।
প্রতিষ্ঠানটির নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো, পুরোনো যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অধিক দক্ষ যন্ত্র বসানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে পারলে একদিকে কারখানার ব্যয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবেশগত শর্তও পূরণ করা সহজ হবে।
ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে শিল্প খাতের কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে আয়োজিত জাতীয় সংলাপে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। গবেষণাটিতে আটটি উৎপাদন শ্রেণির ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানা এবং ৬৫ ধরনের যন্ত্রপাতির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা। বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি দেশে গ্যাস সরবরাহও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎস ব্যবহার করলে কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর মাসিক জ্বালানি ব্যয় গড়ে ৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। কারখানার মোট জ্বালানি চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলে মাসিক ব্যয় কমে প্রায় ৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকায় নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ এভাবে প্রায় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব।
তবে সৌরবিদ্যুৎই একমাত্র সমাধান নয়। কারখানার যন্ত্রপাতির দক্ষতাও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্থাপিত যন্ত্রপাতির মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কাটিং যন্ত্র হলেও পুরোনো যন্ত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের প্রায় ২৭ শতাংশ এখান থেকেই আসতে পারে।
অন্যদিকে পোশাক তৈরির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সেলাই যন্ত্র মোট যন্ত্রপাতির প্রায় ৮৫ শতাংশ। কিন্তু এসব যন্ত্র পরিবর্তন করলে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পরিমাণ ৩ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ সব যন্ত্রপাতি একসঙ্গে বদলে ফেলার পরিবর্তে যেসব যন্ত্রে ব্যয় কমানোর সুযোগ বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অর্থনৈতিকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে।
তবে এখানেই বড় বাধা অর্থায়ন। বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলোর জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা কঠিন। অনেক কারখানার পুরোনো যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকলেও এককালীন বড় বিনিয়োগ করার সক্ষমতা নেই।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সহকারী সহসভাপতি আসিফ শাহরিয়ার মনে করেন, সীমিত অর্থায়ন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দক্ষ সেবা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ যাচাইয়ের জন্য অভিন্ন পদ্ধতির অভাব শিল্প খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করছে।
ছোট ছোট প্রকল্পকে আলাদাভাবে অর্থায়ন করার পরিবর্তে একাধিক প্রকল্পকে একত্র করে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এতে ছোট কারখানাগুলোর জন্য অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাও স্থাপন করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন আসিফ। এ ব্যবস্থায় কারখানাকে শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা কিনতে হবে না। অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা করবে এবং কারখানা নির্দিষ্ট সেবামূল্য পরিশোধ করবে। এতে প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, ইউরোপের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনসংক্রান্ত কঠোর নিয়মকানুনের কারণে বাংলাদেশের হাতে সময় খুব কম।
বিশ্বের অন্যান্য পোশাক উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পিছিয়ে রয়েছে। ফলে এখন বিনিয়োগে দেরি হলে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে শুধু প্রণোদনা ঘোষণা করলেই যে শিল্পে তার সুফল পৌঁছায় না, সেটিও তুলে ধরেছেন ফজলে শামীম। তাঁর নিজের পরিবেশবান্ধব মানসম্পন্ন কারখানা থেকেও প্রতিশ্রুত কর সুবিধার পুরো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, কোনো প্রণোদনা যদি বাস্তবে করের বোঝা কমাতে না পারে, তাহলে সেই প্রণোদনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
শিল্প খাতে সব ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা যে সরাসরি বিদ্যুৎনির্ভর করা সম্ভব, এমন ধারণার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সময় যৌথ জ্বালানি অবকাঠামোর পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন অতিরিক্ত বাষ্পকে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের মতো সমন্বিত ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে।
অন্যদিকে পুরোনো কারখানাগুলোর জন্য ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেখানেও অর্থায়ন ও নীতিগত বাধা রয়েছে। অর্থের উৎস থাকলেও তা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সহজলভ্য নয়—এটাই বড় সমস্যা।
বাংলাদেশ সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ সৌর প্যানেল, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর করের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর বাড়তি কর থাকলে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগ আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, দেশের জ্বালানি খাতে এখন জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দেশের গ্যাসের মজুত কমে আসছে এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে না। ফলে গ্যাসনির্ভর বয়লার, ডিজেলচালিত পরিবহন এবং সেচব্যবস্থার জন্য বিকল্প জ্বালানি নিয়ে এখন থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদেরও যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের পরিচালক শামীম মুনির উদ্দিনের মতে, কারখানায় জ্বালানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা জরুরি। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে জ্বালানি খরচ কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
নীতিগত সিদ্ধান্তও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে কারখানাগুলোকে প্রায় ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ সম্মিলিত করের চাপ প্রায় ১৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর এমন কর আরোপ করলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি বিদ্যা অমৃত খানও মনে করেন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে দ্রুত যেতে না পারলে বাংলাদেশের পোশাক খাত তার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাতে পারে।
বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে এখন শুধু পণ্যের মান ও দাম নয়, একটি পণ্য তৈরি করতে কতটা কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, কত জ্বালানি ও পানি ব্যবহার করা হয়েছে এবং উৎপাদনে কী পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়েছে—এসব তথ্যও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব শর্ত রপ্তানিকারকদের ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের পোশাক খাতের সামনে বিষয়টি আর শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়; এটি সরাসরি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানাগুলো একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমাতে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন পরিবেশগত চাহিদা পূরণ করে বাজার ধরে রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তির অভাবের চেয়ে নীতিগত ও অর্থায়নসংক্রান্ত বাধাই এখন বড় হয়ে উঠছে। উচ্চ ঋণের খরচ, জামানতের শর্ত এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ। একদিকে গ্যাসের সংকট ও বাড়তি জ্বালানি ব্যয় উৎপাদনকে কঠিন করে তুলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এখন আর ভবিষ্যতের কোনো বিলাসী পরিকল্পনা নয়। এটি শিল্পটির টিকে থাকা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখার জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

