বাংলাদেশের অর্থনীতির খবর জানতে সাধারণত আমাদের কয়েক মাস আগের জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, আমদানি-রপ্তানি বা ঋণের তথ্যের দিকে তাকাতে হয়। কিন্তু ব্যবসা এখন কেমন চলছে কারখানায় অর্ডার বাড়ছে কি না, উৎপাদন কতটা হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না এসবের অনেকটাই জানা যায় আরও দ্রুত। সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘পারচেজিং ম্যানেজার্স’ ইনডেক্স’ বা পিএমআই।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) আয়োজিত এক আলোচনায় ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশে এই সূচকের ব্যবহার আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ২১ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় পিএমআইকে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও নীতিনির্ধারণের জন্য দ্রুত অর্থনৈতিক সংকেত পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমসিসিআইর তথ্য অনুযায়ী, আলোচনাটি তাদের গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি কামরান টি. রহমান ও পিইবির চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
জিডিপির খবর আসার আগেই কী জানায় পিএমআই?
সহজ করে বললে, পিএমআই হলো ব্যবসার ভেতরের খবর দ্রুত জানার একটি ব্যবস্থা। প্রতি মাসে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সরবরাহ, মজুত ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। বাংলাদেশের পিএমআইতে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা এই চারটি বড় খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ৫০০টির বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপের ভিত্তিতে সূচকটি তৈরি করা হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হলো ৫০। পিএমআই ৫০-এর ওপরে থাকলে আগের মাসের তুলনায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ বোঝায়, আর ৫০-এর নিচে গেলে সংকোচনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং অর্থনীতির গতিপথ কোন দিকে যাচ্ছে, তার একটি আগাম সংকেত। এ কারণেই পিএমআইকে ‘লিডিং ইন্ডিকেটর’ বলা হয়।
সংখ্যাগুলো কিন্তু সবসময় একই গল্প বলে না
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পিএমআইয়ের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মে মাসে দেশের সামগ্রিক পিএমআই ৮ দশমিক ২ পয়েন্ট বেড়ে ৬২ দশমিক ৮-এ উঠেছিল। তখন উৎপাদন ও সেবা খাতে শক্তিশালী সম্প্রসারণের পাশাপাশি নির্মাণ খাতও সংকোচন থেকে বেরিয়ে এসেছিল।
কিন্তু পরের মাসেই চিত্র বদলে যায়। জুনে পিএমআই ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৫২ দশমিক ৯-এ নেমে আসে। অর্থনীতি তখনও সম্প্রসারণ অঞ্চলে ছিল, কিন্তু গতি অনেক কমে যায়। উৎপাদন ও নির্মাণ খাত সংকোচনে চলে যায়, অন্যদিকে কৃষি ও সেবা খাত সম্প্রসারণ ধরে রাখলেও সেই গতি ছিল তুলনামূলক ধীর।
এখানেই পিএমআইয়ের আসল মূল্য। শুধু ‘পিএমআই ৫২ দশমিক ৯’ বললে হয়তো মনে হবে অর্থনীতি ভালোই চলছে। কিন্তু সূচকের ভেতরের খাতভিত্তিক তথ্য দেখলে বোঝা যায়, অর্থনীতির সব অংশ একই গতিতে চলছে না। একজন নীতিনির্ধারকের জন্য এই পার্থক্যটাই অনেক সময় সামগ্রিক সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসার জন্য কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?
ধরুন, একটি পোশাক কারখানা দেখছে নতুন অর্ডার কমছে, কাঁচামাল কেনা কমেছে এবং উৎপাদনের পরিকল্পনাও কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে। সরকারি জিডিপি পরিসংখ্যানে এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু এমন শত শত প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা যদি একই সময়ে জরিপে উঠে আসে, পিএমআই সেই পরিবর্তনের একটি আগাম ছবি দিতে পারে।
এই তথ্য ব্যবসার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাতে নতুন অর্ডার বাড়ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং উৎপাদন বাড়ছে তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে পারে। বিপরীতে সরবরাহ সমস্যা, ব্যয় বৃদ্ধি বা অর্ডার কমার প্রবণতা দেখা গেলে তারা আগেই সতর্ক হতে পারে। পিএমআইর নিজস্ব ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, সূচকটি ব্যবসা, অর্থনীতিবিদ, সরকার ও বিনিয়োগকারীদের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে দ্রুত ধারণা দিতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের জন্যও ‘আগাম সতর্কবার্তা’
বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে যেখানে জিডিপি, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন কিংবা অন্যান্য বড় সূচকের তথ্য প্রকাশে সময় লাগে, সেখানে এমন মাসভিত্তিক সূচকের গুরুত্ব আরও বেশি। পিএমআইয়ের মাধ্যমে যদি দেখা যায় উৎপাদন খাতে অর্ডার ও কর্মসংস্থান ধারাবাহিকভাবে কমছে, তাহলে নীতিনির্ধারকরা শুধু জিডিপির পরবর্তী হিসাবের অপেক্ষায় না থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ঋণ, আমদানি বা অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতার দিকে আগে নজর দিতে পারেন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে পিএমআই চালুর সময়ও এমসিসিআই ও পিইবি বলেছিল, এই সূচক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রাথমিক প্রবণতা ধরতে এবং ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। তখন পিএমআই তৈরিতে যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের কারিগরি সহায়তার কথাও জানানো হয়েছিল।
তবে পিএমআইকে জিডিপির বিকল্প ভাবলে ভুল হবে
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। পিএমআই কোনো অর্থনীতির পুরো হিসাব নয়। এটি জরিপভিত্তিক সূচক এবং মূলত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড ও প্রত্যাশার পরিবর্তন তুলে ধরে। তাই পিএমআই বাড়লেই যে জিডিপি একই হারে বাড়বে, কিংবা পিএমআই কমলেই অর্থনীতি মন্দায় চলে যাবে এমন সরল সম্পর্ক করা ঠিক হবে না।
বরং পিএমআইকে অন্যান্য অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। যেমন, জুনের পিএমআই কমার পেছনে দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু এবং ঈদের আগে বাড়তি চাহিদা কমে যাওয়ার মতো কারণ কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে কৃষি ও সেবা খাত সম্প্রসারণে থাকলেও উৎপাদন ও নির্মাণে সংকোচন দেখা গেছে। ফলে শুধু একটি সংখ্যা দেখে অর্থনীতির পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম থেকে ব্যবসার সিদ্ধান্ত দুই জায়গাতেই ব্যবহার বাড়াতে হবে
আলোচনায় পিএমআইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান ও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থনীতির অনেক আলোচনা এখনো কয়েক মাস পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভর করে। অথচ একজন শিক্ষার্থী যদি একই সঙ্গে পিএমআই, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, আমদানি-রপ্তানি ও জিডিপির তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখেন, তাহলে অর্থনীতির পরিবর্তনকে আরও বাস্তবভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশে পিএমআই প্রকাশের শুরু থেকেই এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি নিয়মিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা, যা ব্যবসা ও নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা যায়। এখন চ্যালেঞ্জ হলো শুধু সূচক প্রকাশ করা নয়, বরং এর ভেতরের তথ্য কতটা গভীরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত পিএমআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়তো এর একটি সংখ্যায় নয়, বরং সেই সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকা গল্পে। ৫০-এর ওপরে মানেই ভালো আর নিচে মানেই খারাপ এভাবে দেখলে পিএমআইয়ের অর্ধেক মূল্যই হারিয়ে যায়। কোন খাতে অর্ডার বাড়ছে, কোথায় উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান কোন দিকে যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন এসব একসঙ্গে পড়তে পারলেই বোঝা যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আসলে কোন দিকে হাঁটছে। আর সরকারি বড় পরিসংখ্যান প্রকাশের আগেই সেই পরিবর্তনের আভাস পাওয়া এটাই পিএমআইকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আলোচনায় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

