বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হলেও এর বড় অংশই ভারতের পণ্য আমদানিতে যায়। এমন সময়ে ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি সিআইআইয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বাজারসুবিধা, বিনিয়োগ ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বাধা কমানোর বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে পারে।
১৮ সদস্যের সিআইআই প্রতিনিধিদল আজ সোমবার ঢাকায় আসছে দুই দিনের সফরে। সফরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। প্রতিনিধিদলে গডরেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, আরভিন্দ লিমিটেড, মাহিন্দ্রা গ্রুপ, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, গডরেজ কনজিউমার প্রোডাক্টস, অ্যাপোলো হাসপাতালসহ বড় ভারতীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা থাকছেন।
১২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যে আসল ছবিটা কী?
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের আকার বড় হলেও দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারসাম্যহীনতা। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ১১.০৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে প্রায় ১.৮৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ শুধু ওই বছরেই ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৯.২২ বিলিয়ন ডলার।
এখানেই এবারের বৈঠকের গুরুত্ব। দুই দেশের মোট বাণিজ্য কত বিলিয়ন ডলার এই সংখ্যা শুনতে বড় মনে হলেও বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বাণিজ্যে বাংলাদেশ কতটা বিক্রি করতে পারছে? ভারত বাংলাদেশের খুব কাছের বিশাল একটি বাজার। অথচ বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি ভারতের বাজারে তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর বদলে এবার যদি বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো যায়, তাহলে একই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগও বাড়বে।
বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০২৩-২৪ সালের তথ্যেও দেখা যায়, ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১.৫৭ বিলিয়ন ডলারের। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলার এবং জার্মানিতে প্রায় ৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবে এত কাছের একটি বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম।
ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এবার কী চান?
সিআইআই বলছে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাজারে প্রবেশের সুযোগ, অশুল্ক বাধা কমানো এবং সীমান্ত অবকাঠামো উন্নত হলে বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে।
বাস্তবে এই তিনটি বিষয়ই ব্যবসার খরচের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ভারতে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে শুধু পণ্য ভালো হলেই হবে না। সীমান্তে পণ্য ছাড়াতে কত সময় লাগছে, পরীক্ষার প্রক্রিয়া কতটা সহজ, কোন কোন মানদণ্ড পূরণ করতে হচ্ছে, বন্দরের অবকাঠামো কেমন এবং একটি পণ্য বাজারে পৌঁছাতে মোট কত খরচ হচ্ছে এসব বিষয়ও প্রতিযোগিতা ঠিক করে দেয়।
একই কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিধিদলে ভোক্তা পণ্য, প্রকৌশল, অবকাঠামো, অটোমোবাইল ও স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রতিষ্ঠান থাকায় আলোচনাটি শুধু আমদানি-রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের বাজারে স্থানীয় উৎপাদন, যৌথ বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। প্রতিনিধিদলের নির্ধারিত বৈঠকগুলোর তালিকাতেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ দুই বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও ব্যবসার দরজা খোলা
এই সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন রয়েছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন বন্দর ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কারণে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই সম্পর্ককে আবার স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে তার প্রভাব শুধু কূটনৈতিক বৈঠকে সীমাবদ্ধ থাকে না; সীমান্ত বাণিজ্য, পরিবহন, পণ্য ছাড়করণ, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এবং ব্যবসায়ীদের আস্থাতেও পড়ে। একটি ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করবে কি না, কিংবা বাংলাদেশের কোনো রপ্তানিকারক ভারতে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা খুঁজবে কি না এসব সিদ্ধান্তের পেছনে স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখে।
তবে এবার বাংলাদেশের জন্য শুধু ‘সম্পর্ক ভালো করা’ যথেষ্ট নয়। আলোচনার টেবিলে যদি বাজারসুবিধা, অশুল্ক বাধা, সীমান্তে পণ্য চলাচলের সময়, মান যাচাই, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরির মতো নির্দিষ্ট বিষয় আসে, তবেই এই সফরের অর্থনৈতিক ফল দৃশ্যমান হতে পারে।
বড় বাজার সামনে, কিন্তু বাংলাদেশের পণ্য কোথায়?
ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের আরও সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা আর বাজার দখল করা এক বিষয় নয়। ভারতীয় বাজারে স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা যেমন আছে, তেমনি বিভিন্ন অশুল্ক বাধা ও পণ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রক শর্তও রপ্তানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্পের জন্য ভারতের কাছ থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগও কম নয়। ফলে সম্পর্কটিকে শুধু ‘বাংলাদেশ কত পণ্য ভারতে বিক্রি করবে’ বনাম ‘ভারত কত পণ্য বাংলাদেশে বিক্রি করবে’ এই দুই ভাগে দেখলে পুরো সম্ভাবনাটি ধরা পড়বে না। বরং দুই দেশের উৎপাদনব্যবস্থাকে এমনভাবে যুক্ত করা সম্ভব কি না, যাতে একটি দেশের কাঁচামাল অন্য দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৃতীয় বাজারে যায় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত তাই সিআইআই প্রতিনিধিদলের এই সফরের সাফল্য মাপার আসল মানদণ্ড হবে বৈঠকের সংখ্যা নয়, বৈঠকের পর কতগুলো বাস্তব ব্যবসায়িক বাধা কমল। বাংলাদেশের রপ্তানি যদি ভারতের বাজারে বাড়ে, ভারতীয় বিনিয়োগ যদি দেশে নতুন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং সীমান্ত বাণিজনের সময় ও খরচ কমে, তখনই ১২ বিলিয়ন ডলারের বর্তমান বাণিজ্য সম্পর্কটি দুই দেশের জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও লাভজনক হয়ে উঠবে।

