কৃষি ও পল্লি অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এই লক্ষ্য ছিল ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
শুধু ঋণের পরিমাণ বাড়ানো নয়, কৃষকের কাছে সহজ শর্তে অর্থ পৌঁছে দিয়ে উৎপাদন বাড়ানোই এবার মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগে এই হার ছিল আড়াই শতাংশ।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান নতুন কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও কৃষিঋণ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও উপস্থিত ছিলেন।
বেসরকারি ব্যাংকের ওপর বেশি দায়িত্ব
নতুন লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। আর বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য রাখা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ কৃষিঋণ বিতরণে এবার বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছে ঋণ পৌঁছানো সম্ভব হবে।
তবে শুধু বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করলেই কর্মসূচির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। প্রকৃত কৃষকের কাছে সময়মতো টাকা পৌঁছানো এবং সেই অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা।
ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমানও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণে জামানত লাগবে না
নতুন নীতিমালায় কৃষকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও রাখা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ এবং আড়াই একর জমিতে লবণ চাষের ঋণে নথিপত্রের খরচ ছাড়া অন্য কোনো সেবা ফি নেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে কোনো জামানত নেওয়া যাবে না। নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি সামাজিক ও দলগত জামানতের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ধরনের সুবিধা কৃষির সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ জামানতের অভাব এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার জটিলতা অনেক সময় ছোট কৃষকের ঋণ পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
নতুন নতুন কৃষিকাজেও মিলবে ঋণ
কৃষিঋণের পরিধিও এবার বাড়ানো হয়েছে। শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, শতমূল, গাছ আলু, ডিমের খোসা ও ব্লু বেরি ব্যবহার করে জৈব সার উৎপাদনকে কৃষিঋণের আওতায় আনা হয়েছে।
এ ছাড়া হ্যাচারিতে মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের মতো কর্মকাণ্ডেও ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এর ফলে কৃষিঋণ শুধু প্রচলিত ধান, সবজি বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষিকে ঘিরে গড়ে ওঠা নতুন ও বিকল্প আয়ের কর্মকাণ্ডও ব্যাংকিং অর্থায়নের আওতায় আসার সুযোগ পাবে।
প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ
কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থ আসলে কার হাতে যাচ্ছে?
নতুন নীতিমালায় প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করার জন্য স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন অথবা সরকারি কৃষক কার্ড ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে কৃষক কার্ড না থাকলেও ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকবে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রকৃত কৃষক কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব থাকবে ব্যাংকের।
যাচাই না করে ঋণ দেওয়া হলে এর দায়ও ব্যাংককেই নিতে হবে।
কারণ প্রকৃত কৃষকের বদলে অন্য কেউ কৃষিঋণ পেলে সেই অর্থ কৃষির বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনকি এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ডেপুটি গভর্নর।
তাই ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ বিতরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছিল ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল।
ওই সময়ে কৃষিঋণ পেয়েছেন ৩৭ লাখ ৭৭ হাজার ২৩৩ জন।
গত অর্থবছরেই যখন নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে, তখন এবার লক্ষ্যমাত্রা আরও বড় করার পেছনে যুক্তি হলো কৃষি ও পল্লি অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো। তবে লক্ষ্যমাত্রা ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ানোর কারণে ব্যাংকগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
মধ্যস্বত্বভোগী ঠেকাতে নজরদারি বাড়বে
কৃষিঋণ বিতরণে মধ্যস্বত্বভোগীসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কোথাও প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি ঋণ পাচ্ছেন, আবার কোথাও ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ বিতরণ ও ব্যবহারের ওপর নজরদারি আরও বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। নিয়মিত জরিপ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের হাতে অর্থ পৌঁছাচ্ছে কি না এবং ঋণের টাকা কৃষিকাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
এবার ব্যাংকের নিজস্ব শাখা ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ৫০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। বাকি ঋণ তৃতীয় কোনো সংযোগভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিতরণ করা যাবে।
সরাসরি ব্যাংকের শাখা ও নিজস্ব নেটওয়ার্ক ব্যবহার বাড়ানো হলে কৃষকের সঙ্গে ব্যাংকের যোগাযোগও বাড়তে পারে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং গ্রামীণ ব্যবসার সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। এসব খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তবে কৃষিঋণের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে টাকা কত বিতরণ হলো তার ওপর নয়, কারা পেল এবং কী কাজে ব্যবহার করল—তার ওপর।
৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য তাই নিঃসন্দেহে বড় উদ্যোগ। কিন্তু এই বিপুল অর্থ যদি প্রকৃত কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সহজ শর্তে পৌঁছায়, তাহলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতি আনতে পারে। অন্যদিকে ঋণ বিতরণ শুধু সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
পুনঃঅর্থায়নেও থাকছে বড় বরাদ্দ
নতুন কর্মসূচিতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং তিন হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের নীতিমালার সারসংক্ষেপ রাখা হয়েছে।
ক্ষুদ্র কৃষক, নতুন উদ্যোক্তা এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন খাতকে ঋণের আওতায় আনার সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু কৃষকের চলতি প্রয়োজন মেটানো নয়; বরং কৃষি ও পল্লি অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড বাড়ানো।
সব মিলিয়ে, কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন। এখন দেখার বিষয়, এই বাড়তি অর্থ কতটা সহজে প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং তা দেশের কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

