বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটছে না বরং পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। তাঁর ভাষায়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে উৎপাদনশীল অর্থনীতির উপযোগী অবস্থায় আনতে সময় লাগবে। তবে এর মধ্যে জরুরি চাহিদা মেটাতে আমদানি বাড়ানো, জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সাকি বলেন, দেশের জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধান না হলে অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন। সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তার একটি অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি বয়লারে ত্রুটির কারণে হয়েছে বলে জানান তিনি। সেগুলো মেরামতের পর পরিস্থিতি এক মাস আগের তুলনায় সহনীয় হয়েছে। কিন্তু এখানেই স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, বর্তমান চাহিদার তুলনায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশের গ্যাসের হিসাব দেখলেই সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে এলএনজিসহ দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,৭০৪ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রকাশিত চাহিদা পূর্বাভাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট গ্যাসের চাহিদা ৪,৫৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪,৭৬১ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছানোর অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু আজকের সরবরাহ ঘাটতি নয়; সামনে চাহিদা আরও বাড়বে।
জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন উৎস খুঁজে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। কিন্তু গ্যাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেল আমদানির মতো সরল নয়। এলএনজি বিদেশ থেকে কিনে দেশে আনলেই সেটি সরাসরি পাইপলাইনে দেওয়া যায় না; সেটিকে গ্রহণ, সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের জন্য এলএনজি টার্মিনাল ও রিগ্যাসিফিকেশন অবকাঠামো প্রয়োজন। ফলে নতুন গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই গ্যাস ভোক্তার কাছে পৌঁছানো দুটির মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকে। এ কারণেই নতুন অবকাঠামো তৈরি না করে শুধু আমদানি বাড়ালে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকিও। চলতি বছরে কাতারএনার্জি থেকে বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় পেট্রোবাংলাকে বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেটের দিকে বেশি যেতে হয়েছে। জুলাইয়ে রয়টার্স জানিয়েছিল, কাতারএনার্জির নির্ধারিত ২০২৬ সালের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে এবং ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে আরও স্পট কার্গো সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর অর্থ হলো, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু দেশীয় উৎপাদনের ওপর নয়, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক দামের ওপরও নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এখানেই সরকারের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যে পরিমাণ জরুরি তেল মজুত আছে, তা প্রায় দেড় মাসের চাহিদা মেটাতে পারে বলে সাকি জানিয়েছেন। সরকার প্রথমে এই সক্ষমতা তিন মাসে নেওয়ার এবং পরে নতুন সংরক্ষণাগার তৈরি করে ছয় মাস পর্যন্ত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। জুনে একটি সংসদীয় কমিটিও দেশের কৌশলগত জ্বালানি মজুত অন্তত তিন মাসের সমপরিমাণ করার সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ সরকার এখন বুঝতে পারছে, শুধু সংকটের সময় বাজার থেকে জ্বালানি কিনে পরিস্থিতি সামাল দিলে হবে না; সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক মাস টিকে থাকার মতো বাফারও দরকার।
দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভর করেও জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি করা কঠিন। পেট্রোবাংলার তথ্য ও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে এবং এর বিপরীতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, নতুন কূপ থেকে উৎপাদন বাড়লেও পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় মোট দেশীয় সরবরাহের ওপর চাপ রয়ে গেছে। একই সময়ে ২০২৬ সালে কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় বাইরের ধাক্কা কত দ্রুত দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সাকি জানিয়েছেন, সরকার একদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বিষয়টি শুধু পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে অর্থনীতির খরচ ও ঝুঁকিও জড়িত। একটি দেশ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক দামের বড় ওঠানামা সরাসরি উৎপাদন খরচ, ভর্তুকি, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। চলতি বছর এলএনজি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় যে সরকারি ভর্তুকির ওপরও চাপ তৈরি করেছে, তার উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে।
সরকারের পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গেও জ্বালানি খাতের এই পরিকল্পনাকে দেখা হচ্ছে। ‘ফ্র্যাজিলিটি থেকে প্রসপারিটি’ ধারণার অধীনে প্রথম দুই বছরকে পুনরুদ্ধারের সময়, পরের তিন বছরকে রূপান্তরের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের দৃষ্টিতে বর্তমান জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিক কোনো একক প্রকল্প দিয়ে শেষ করার বিষয় নয়; বরং আমদানি, মজুত, দেশীয় অনুসন্ধান, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য শক্তি সব মিলিয়ে একটি নতুন জ্বালানি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবশ্যই সময় নিয়ে। দেড় থেকে দুই বছর সময় চাওয়া মানে আগামী কয়েক মাসেই শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সাধারণ ভোক্তার সমস্যার পুরো সমাধান হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। আবার শুধু সময় চাইলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই সময়ের মধ্যে নতুন গ্যাস কূপ থেকে বাস্তব উৎপাদন কতটা বাড়ল, এলএনজি সরবরাহের বিকল্প উৎস কতটা নিশ্চিত হলো, জ্বালানি মজুত কতটা বাড়ল এবং নতুন অবকাঠামো বাস্তবে কত দ্রুত তৈরি হলো এসব ফলাফলই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে এই দুই বছর ছিল প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনের সময়, নাকি সমস্যার সমাধান আরও পিছিয়ে যাওয়ার আরেকটি অধ্যায়। কারণ বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য জ্বালানি এখন আর শুধু একটি খাত নয়; জ্বালানি সরবরাহ ঠিক থাকলেই উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির চাকা ঠিকভাবে ঘুরবে।

