বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট আরও কিছুদিন পরেই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই খবরটা যেমন আশার, তেমনি কিছু জটিলতাও আছে। গেজেট প্রকাশের সময়সীমা পিছিয়েছে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। আর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে অক্টোবর থেকে। কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকেই কার্যকর ধরা হবে। মানে, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের বেতন বকেয়া হিসেবে পরে মেটানো হবে।
প্রথমে পরিকল্পনা ছিল আগস্টের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের। কিন্তু বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এই সব বিষয় পর্যালোচনা করতে গিয়ে সময় পিছিয়েছে। এখন সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, অক্টোবর থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে শুরু করবেন। তবে নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া হিসেবে সমন্বয় করা হবে。
কিন্তু এই বকেয়া টাকা কি একসঙ্গেই পাওয়া যাবে? সেটাও নিয়ে আছে জটিলতা। মূল্যস্ফীতির চাপ ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বকেয়া অর্থ একসঙ্গে না দিয়ে কয়েক ধাপে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের ওপর একবারে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ কমবে। অর্থাৎ, চাকরিজীবীদের হয়তো ধৈর্য ধরতে হবে আরও কিছুদিন।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে, তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে আরও একটি বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকে অবশিষ্ট বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিসভায় পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সচিব কমিটির আগের বৈঠকগুলোতে বেতন কমিশনের সুপারিশ, গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেতন কাঠামোতে কতটুকু পরিবর্তন আসছে। কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল。 অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে。 তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কমিশনের পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়নে কিছুটা কাটছাঁটের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মূল বেতন বৃদ্ধির হার এবং কয়েকটি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
আরেকটি বড় খবর হলো, নতুন পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে, আর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা দেওয়া হবে। এই দুই ধাপের হিসাবটা অনেকের কাছে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু সহজ ভাষায় বললে, প্রথমে মূল বেতন বাড়বে, তারপর বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা এগুলো ধাপে ধাপে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগেই জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কী হবে? বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুরোনো বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন। নতুন গেজেট প্রকাশের পর ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণ এবং বকেয়া অর্থ সমন্বয় করা হবে। তবে সেই বকেয়া কখন এবং কীভাবে মিলবে সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এই পে-স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়, এটি তাদের জীবিকার একটি বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর যখন গেজেট প্রকাশিত হবে, তখন হয়তো অনেকের মুখে হাসি ফুটবে। কিন্তু বকেয়া অর্থ কয়েক ধাপে পাওয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা অনেকের জন্যই হতাশারও কারণ হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, অন্তত অক্টোবর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হচ্ছে এটুকু নিশ্চিত।

