আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয় সাড়ে চার হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের একটি নতুন প্রতিবেদনে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ মাথাপিছু আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার হাজার পাঁচশ একানব্বই ডলার, যেখানে বিদায়ী অর্থবছরে এই আয় ছিল প্রায় তিন হাজার ডলারের কাছাকাছি।
গতকাল বুধবার প্রকাশিত ‘ভঙ্গুরতা থেকে সমৃদ্ধির দিকে অর্থনীতির রূপান্তর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ের জন্য একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ্য, মাথাপিছু আয় বলতে বোঝায় দেশের অভ্যন্তরীণ আয় ও প্রবাসী আয়সহ মোট জাতীয় আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পাওয়া গড় হিসাব, যা কোনো একক ব্যক্তির প্রকৃত আয় নয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে গত জুলাই মাসে এই হার ছিল সাড়ে আট শতাংশের কাছাকাছি।
একইসঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকেও রেকর্ড পর্যায়ে নিতে চায় সরকার। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সাড়ে ছয় শতাংশ ধরা হলেও প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিবছরই তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে সাড়ে আট শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জিইডির পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম বছরকে বলা হচ্ছে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার সময়কাল, যেখানে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি উন্নয়নের মাধ্যমে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
প্রথম থেকে তৃতীয় বছর পর্যন্ত সময়কে পুনঃস্থাপনের পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং চাপে থাকা ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা আনার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এরপর তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছর পর্যন্ত সময়কে বলা হচ্ছে পুনর্গঠন ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণের পর্যায়, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
একটি বেসরকারি নীতি গবেষণা সংস্থার চেয়ারম্যান এই পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, এটি সরকারের একটি ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাভাবনার প্রতিফলন এবং এতে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। তবে তাঁর মতে, কর্মসংস্থান, কর ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে, যা বর্তমান প্রতিবেদনে যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে উল্লেখ নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি খাতের ঝুঁকি, বিনিয়োগ মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, আর এসব মোকাবিলায় কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ আদায়, তদারকি জোরদার এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সংস্কার পরিকল্পনাও তৈরি করেছে সরকার। দেশের ব্যাংক খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ব্যাংকের মূলধন ও মুনাফা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।
এই সংস্কার তিনটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে—প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, পরের দুই বছরে ব্যাংক পুনর্গঠন এবং শেষ দুই বছরে গভীরতর কাঠামোগত সংস্কার। প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বাধীনতা বাড়াতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও আনা হবে।
রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে নীতি ও আদায় বিভাগ পৃথক করার উদ্যোগ ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শুরু হয়েছে। এর বাইরে একক ভ্যাট হার চালু, করছাড় কমিয়ে আনা, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যূনতম কর নির্ধারণের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনা এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কর প্রদান সহজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিবেদনে।
২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ কর-জিডিপি অনুপাত দশ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য—কারণ বিশ্বের সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ।
আগামী পাঁচ বছরে যোগাযোগ খাতকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি নতুন কর্ডলাইন রেলপথ নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ডাবল লাইনে বিদ্যুতায়ন, এবং আরও কয়েকটি রুটে ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত আঞ্চলিক রেল সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর জন্য মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল, কমিউটার রেললাইন ও মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় তাদের জন্য একাধিক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর কয়েকশ তরুণকে স্টার্টআপ তহবিল থেকে সহায়তা প্রদান এবং প্রতিবছর হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা।
সুশাসন প্রতিষ্ঠাকেও অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলাকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

