দেশের অর্থনীতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ডলার মূল্য, কাঁচামালের বাড়তি দাম, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং বেসরকারি খাতে দুর্বল বিনিয়োগের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি শুধু পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং দেশের প্রায় সব ধরনের উৎপাদন কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি শিল্পের উৎপাদন খরচে পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে বা কার্যক্রম সীমিত করে টিকে থাকার চেষ্টা করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন মূল্যবৃদ্ধি শিল্পখাতের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ পাওয়ার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক ধাপে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৪ টাকা, পেট্রল ১১৮ টাকা এবং অকটেন ১২২ টাকা। নতুন মূল্য কার্যকরের পর ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা।
অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৩ টাকা বা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। একই সময়ে কেরোসিনের দাম বেড়েছে ৪১ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পেট্রলের দাম বেড়েছে ৪২ টাকা বা ৩৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং অকটেনের দাম বেড়েছে ৪৩ টাকা বা ৩৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের প্রধান চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এই সময়ে প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, একসঙ্গে বড় পরিমাণে জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে শিল্প ও পরিবহনসহ প্রায় সব খাতেই ব্যয়ের চাপ বাড়বে। তার মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, পাশাপাশি শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা পড়বে উৎপাদন খরচে। কারখানার কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে, কারণ উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়বে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম ছোট করতে বাধ্য হতে পারে, যা কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসার খরচ বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাবে। এর প্রভাব ব্যাংক খাতেও পড়তে পারে এবং ঋণ পরিশোধে সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, এরই মধ্যে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে আরও প্রতিষ্ঠান চাপের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগের ধীরগতি। ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ব্যবসার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর মধ্যে জ্বালানি খরচ বাড়লে নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় নেই। একদিকে ব্যবসার অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও চাপের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মুনাফার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
তিনি আরও বলেন, বড় প্রতিষ্ঠান কিছুটা এই চাপ সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে পারে, বিনিয়োগ পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে কিংবা নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ স্থগিত করতে পারে।
রপ্তানিমুখী শিল্পখাতও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। কারণ দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিল্প ইতোমধ্যে সংকুচিত মুনাফায় পরিচালিত হচ্ছে, তাদের জন্য বাড়তি ব্যয় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এদিকে রাজস্ব আদায় নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যদি উৎপাদন কমিয়ে দেয় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি জানান, গত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি খরচ বাড়লে অনেক প্রতিষ্ঠান কর ও অন্যান্য রাজস্ব পরিশোধে সমস্যায় পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার বিষয় নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে উৎপাদন, পরিবহন, বাজারমূল্য, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই বাড়তি চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

