গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশের অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার কমছে এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একটি পোশাক কারখানা নিজেদের বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ঢাকার সাভারে অবস্থিত ৪এ ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড বর্তমানে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ওয়ালমার্ট, গ্যাপ এবং নেক্সটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর আগেই নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছিল। এর ফলে দেশের অন্যান্য অনেক কারখানা যেখানে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে সমস্যায় পড়েছে, সেখানে ৪এ ইয়ার্ন ডাইং এখনো তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
২০১৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কারখানার ছাদে স্থাপন করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। পাশাপাশি গ্যাস ও ডিজেলভিত্তিক নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস তেল এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে সরাসরি শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাম্প্রতিক এক জরিপে ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করেছে বা কমিয়ে দিয়েছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পেরে বাড়তি খরচ করে বিমানপথে পণ্য পাঠিয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের ধরে রাখতে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে বাধ্য হয়েছে।
তবে ৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের পরিস্থিতি এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। সাভারের এই কারখানায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কর্মী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করে। বাকি বিদ্যুতের বড় অংশ আসে নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব বলেন, তারা কখনো একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করেননি। সবসময় বিকল্প ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে। প্রথমে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, পরে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তবে বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও ৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকা জ্বালানি খরচ যোগ হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
জ্বালানির নতুন মূল্য কাঠামো দেশের পোশাক শিল্পের ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে। কারণ এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এবং দেশের অর্থনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
পোশাক রপ্তানিকারক শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভের পরিমাণ আগে থেকেই সীমিত। নতুন করে জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
তিনি জানান, কানাডার একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মাত্র ৮ হাজার পণ্যের অর্ডার দিয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টিকে থাকা। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তুলনামূলকভাবে কম।
তার মতে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে জ্বালানি সংকট কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায় তার ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ৪এ ইয়ার্ন ডাইং ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। প্রতিষ্ঠানটি বড় আকারের ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যাতে মূল বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলেও কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
প্রতিষ্ঠানটির মালিকের মতে, তারা বাড়তি খরচ বহন করতে পারলেও দেশের সব কারখানার পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই পুরো শিল্প খাতকে সুরক্ষিত রাখতে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু একটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা ছাড়া এই খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আগাম প্রস্তুতি এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য একটি প্রতিষ্ঠানকে বড় সংকটের সময় টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে। তবে পুরো পোশাক শিল্পকে নিরাপদ রাখতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।

