দেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে কয়েকটি সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। তার মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের চাপের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক অর্থনৈতিক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি নিয়ে আয়োজিত এই আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রত্যাশার দিকটিও গুরুত্ব পায়। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অর্থনীতি ও গবেষণা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন।
আলোচনায় উঠে আসা পরিসংখ্যান রীতিমতো উদ্বেগজনক। সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি যেখানে প্রায় ছাব্বিশ শতাংশ ছুঁয়েছে, সেখানে বেসরকারি খাতে এই হার মাত্র পাঁচ শতাংশে আটকে আছে। এই বিশাল ব্যবধান বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বক্তা। তার ভাষ্যমতে, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ, যা জুলাইয়ে সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে সোয়া আট শতাংশে। তবে এই স্বস্তি সাময়িক, কারণ আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গেছে, যা দেশের ভেতরের মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
দারিদ্র্যের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় সাড়ে আঠারো শতাংশ, তিন বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে একুশ শতাংশে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পরোক্ষ প্রভাব— যার কারণে নতুন করে বারো লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়— চলতি বছরের জন্য তা তিন শতাংশের সামান্য বেশি ধরা হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে।
তবে হতাশার পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। তার মতে, চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যবসাবান্ধব বেশ কিছু উদ্যোগ লক্ষণীয়। সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মাত্র দুই দিনে কোম্পানি নিবন্ধনের সুযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা বিদেশে পাঠানোর সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী দশটি নতুন খাতের জন্য শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা চালুর মতো পদক্ষেপগুলো ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার প্রচেষ্টার অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার একশ পঁচিশটি সেবাকে অল্প কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সম্পূর্ণ অনলাইনে আনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে বলেও জানান তিনি। চামড়া, পাদুকা, চাল ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ড সুবিধা তিন বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কর প্রশাসনেও ডিজিটাল রূপান্তরের ছাপ স্পষ্ট— অনলাইন করপোরেট সেবা, স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিভিত্তিক ডিজিটাল অডিট বাছাই পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একক নাগরিক পরিচিতি ও ডিজিটাল ওয়ালেট চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সরকারি সেবা এবং দেশের অধিকাংশ এলাকায় উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর করতে একদিনের মধ্যে মুনাফা প্রত্যাবাসন, মাত্র সাত দিনে ব্যবসায়িক অনুমোদন এবং বিদেশি কর্মীদের জন্য দ্রুত ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি পেশাগত অনুমোদন ব্যবস্থাও চালুর কথা জানানো হয়।
আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নে তিনি সতর্ক করে বলেন, চলতি বাজেটের আকার নয় লাখ ছত্রিশ হাজার কোটি টাকা ছুঁইছুঁই, অথচ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা তার চেয়ে অনেক কম। এর মধ্যে ঋণ পরিশোধের ব্যয়ই সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রেক্ষাপটে দেশীয় ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণনির্ভরতা কমিয়ে কম সুদে বৈদেশিক ঋণ ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। পাশাপাশি আগামী প্রায় এক দশকের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত পনেরো শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।
মুদ্রানীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, নীতি সুদহার সামান্য কমিয়ে সাড়ে নয় শতাংশে নামানো হলেও এর সুফল বেসরকারি খাতে তেমনভাবে পৌঁছায়নি। সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির মধ্যে বিশাল ব্যবধান এখনো বিদ্যমান, যা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সুদ স্প্রেডের সীমা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারি ঋণগ্রহণ সীমিত রেখে বেসরকারি খাতের জন্য পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারের অপর্যাপ্ত বিকাশের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। ব্যাংকনির্ভরতা কমাতে করপোরেট বন্ড ও সুকুক বাজারের সম্প্রসারণ জরুরি বলে মত দেন তিনি। এছাড়া দেশের লজিস্টিক ব্যয় এখনো মোট জিডিপির প্রায় পনেরো থেকে বিশ শতাংশ, যেখানে উন্নত অর্থনীতিতে তা মাত্র আট থেকে দশ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই বাড়তি ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জের বিষয়ে সতর্ক করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তার মতে, উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ও সহজ শর্তের উন্নয়ন সহায়তা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, অথচ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি এখনো স্পষ্ট নয়। এ কারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

