অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই, শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সেমিনারে এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতির বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই। রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত দিনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর ছিল। বিএনপির মৌলিক দর্শন হচ্ছে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পরিচালনা করবে এবং সরকারের দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা, সহায়তা ও সুবিধা দেওয়া। তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টাই আসলে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিনিয়োগ ছাড়া এখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই’।
তবে বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট। অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, জ্বালানি সংকট এখন পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের হাতে থাকা সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর সমাধান হবে ধীরগতিতে। জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধানের সুযোগ নেই’। তবে তিনি আশ্বাস দেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, জ্বালানি খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, ডিরেগুলেশনের বিষয়গুলো সামনে আনতে সরকার কাজ করছে এবং ব্যবসায়ীরা কোথাও বাধাগ্রস্ত হলে তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। তার উপস্থাপনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জিডিপি ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতি একটি বড় উদ্বেগের কারণ, যা জুলাই ২০২৬-এ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি (৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ডিসিসিআই সভাপতি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন, সরকারের ব্যাংক ঋণ গ্রহণ সীমিত রাখা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) সত্যিকার অর্থে কার্যকর করা, রাজস্ব প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর এবং এমএসএমই খাতের জন্য নির্ধারিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ যাতে প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান ডিসিসিআই সভাপতি।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার।
অর্থমন্ত্রী আগেও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছিলেন, কর রাজস্ব বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেছেন, বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি ‘যন্ত্রণাদায়ক’ বিনিয়োগ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি আগেই মন্তব্য করেছিলেন।
সবমিলিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জ্বালানি সংকট ধীরে সমাধান হলেও বিনিয়োগের বিকল্প নেই। ডিসিসিআইয়ের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এবং ডিরেগুলেশন কার্যকর হলে হয়তো বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে। তবে সেই বিনিয়োগ আসবে কবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।

