বাংলাদেশের অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না কর্মসংস্থান। রাজধানীর একটি চাকরির মেলায় মাত্র ৩৭৪টি পদের বিপরীতে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষিত তরুণের ভিড় সেই বাস্তবতাকেই চোখের সামনে তুলে ধরেছে। প্রতিটি পদের জন্য লড়েছেন গড়ে প্রায় ৫৩ জন।
গত সপ্তাহে রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে নেক্সটজবস আয়োজিত ওই চাকরির মেলায় এমন চিত্র দেখা যায়। সেখানে ৭৫টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে অংশ নেয়। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা তরুণদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ চাকরিপ্রার্থীরাও ভিড় করেন। কেউ কাগজে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন, কেউ আবার মুঠোফোনের মাধ্যমে তা পাঠিয়েছেন।
তবে এই ভিড়কে কেবল একটি চাকরির মেলার দৃশ্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, অন্যদিকে তাদের তুলনায় পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে, আর একটি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে।
চাকরির মেলার একটি ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও পরিষ্কার করে। শক্তি ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ ফারুক হোসাইন খান জানিয়েছেন, মাত্র দুটি পদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০টি আবেদন পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য উপযুক্ত প্রার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ খালি হলে সেখান থেকে কর্মী নেওয়ার চেষ্টা করবে। ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসও সীমিতসংখ্যক শূন্যপদের বিপরীতে অনেক বেশি প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে।
অর্থাৎ চাকরির বাজারে এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নিয়োগদাতারা ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করছেন, অথচ বর্তমানের বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর জন্য তাৎক্ষণিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে খুব কম।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সংকট অবশ্য শুধু চাকরির মেলার দীর্ঘ সারিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নতুন চাকরি তৈরির সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ২০০০-১০ সময়ে প্রায় ০.৫৭ ছিল। ২০১৬/১৭-২০২২ সময়ে তা কমে ০.৩৪-এ দাঁড়ায়। এরপর ২০২২-২৪ সময়ে সূচকটি ঋণাত্মক হয়ে যায়, যার মান ছিল -০.০৯।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও সেই সম্প্রসারণ আগের মতো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে না। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু তার সুফল শ্রমবাজারে সমানভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
সমস্যাটি তরুণদের মধ্যে আরও তীব্র। ২০২৪ সালে সরকারি হিসাবে দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬৯ শতাংশ। কিন্তু তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। শহরের তরুণদের ক্ষেত্রে তা আরও বেড়ে ১৩.২৭ শতাংশে পৌঁছেছে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরাঞ্চলে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে। তাদের বেকারত্বের হার ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ কর্মজীবনে প্রবেশের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। বরং অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে উপযুক্ত চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও একই ধরনের বৈপরীত্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৮.৭ শতাংশ, যেখানে তুলনামূলক কম শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৩.০১ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন; তাদের বেকারত্বের হার ছিল ১৬.৬৬ শতাংশ।
এখানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে আসে। দেশে শুধু চাকরির সংখ্যা কম—এমন নয়। বরং শিক্ষিত মানুষের যোগ্যতা, তাদের প্রত্যাশা এবং নিয়োগদাতাদের প্রয়োজনের মধ্যে বড় ধরনের অমিল তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিপুলসংখ্যক স্নাতক তৈরি করছে, কিন্তু শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যে ধরনের ব্যবহারিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা চায়, অনেক চাকরিপ্রার্থীর সেই দক্ষতা নেই।
ফলে একদিকে তরুণেরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকার পরও সাক্ষাৎকারের সুযোগ পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে নিয়োগদাতারা বলছেন, প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি চলতে থাকলে বেকারত্ব কমানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তৈরি পোশাক শিল্পের দিকে তাকালেও বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। গত দুই দশকে তৈরি পোশাক রপ্তানি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে এ শিল্পে কর্মরত মানুষের সংখ্যা মোটামুটি ৪.০ মিলিয়নের আশপাশেই রয়ে গেছে।
অর্থাৎ রপ্তানি বেড়েছে অনেক, কিন্তু কর্মসংস্থান একই হারে বাড়েনি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বয়ংক্রিয়তার কারণে কম শ্রমিক দিয়েও এখন বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। শিল্পের দক্ষতার জন্য এটি ইতিবাচক পরিবর্তন হলেও কর্মসংস্থানের দিক থেকে এর একটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। পুরোনো খাতগুলো যদি কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন করতে শুরু করে, তাহলে নতুন শ্রমশক্তিকে গ্রহণ করার জন্য নতুন শিল্প ও সেবা খাত তৈরি করতেই হবে।
তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশার সাম্প্রতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, একসময় তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২২ সালে তা কমে প্রায় ৩৯ শতাংশে নেমে আসে।
এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে নারীদের আয়মূলক কাজে যুক্ত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। ফলে এই শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি শিল্পের কর্মসংস্থান কাঠামো বদলে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং পরিবারের আয় কাঠামোর বিষয়ও জড়িত।
চাকরির সংকট যে কতটা গভীর, তার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া গেছে জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত একটি শিক্ষানবিশি মেলায়। সেখানে প্রায় ১০ হাজার স্নাতক প্রায় ২,৫০০টি বেতনভুক্ত শিক্ষানবিশির সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করেন। মেলায় অংশ নেয় ১০০টি প্রতিষ্ঠান।
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর সরাসরি চাকরি তো দূরের কথা, কর্মজীবনে প্রবেশের প্রাথমিক সুযোগ নিয়েও তরুণদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শিক্ষিত বেকারত্ব শুধু ব্যক্তিগত হতাশা তৈরি করবে না, বরং দেশের মানবসম্পদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখবে।
বর্তমান সরকারের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছরে ১০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু চাকরির মেলা, সরকারি নিয়োগ বা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
প্রয়োজন হবে বেসরকারি বিনিয়োগের বড় ধরনের সম্প্রসারণ। নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হবে, শ্রমঘন উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিমুখী নতুন শিল্প তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সেবা খাতেও বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও কুটির শিল্পের ভূমিকা এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। সহজ ঋণ, কম সুদের অর্থায়ন, ব্যবসা পরিচালনার সুবিধা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু সনদনির্ভর উচ্চশিক্ষা দিয়ে কর্মসংস্থানের সংকট সমাধান হবে না। শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় থেকেই বাস্তব কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধির সংজ্ঞা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। অর্থনীতির আকার বাড়ছে কি না, প্রবৃদ্ধির হার কত—এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের জীবনে সেই প্রবৃদ্ধির প্রভাব কতটা পড়ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি অর্থনীতির আকার বাড়ে অথচ নতুন চাকরি না বাড়ে, তাহলে প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বড় অংশের কাছে পৌঁছাবে না।
ফার্মগেটের সেই চাকরির মেলায় ২০ হাজার তরুণের ভিড় তাই শুধু একটি দিনের দৃশ্য নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় প্রশ্নের প্রতিচ্ছবি। ৩৭৪টি পদের জন্য ২০ হাজার মানুষের প্রতিযোগিতা দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য অর্থনীতিকে আরও বেশি কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নেই। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যা মানুষের জন্য বাস্তব কাজের সুযোগ তৈরি করে। নইলে চাকরির বাজারে আজকের দীর্ঘ সারি আগামী দিনে আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

