দেশের সফল গ্যাসকূপগুলোর অধিকাংশই চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। এবার উত্তরাঞ্চলেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার। পাবনার সুজানগর উপজেলার মোবারকপুরে আবারও গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে কূপ খননের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আশা করছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সুজানগরের আহমেদপুর ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে অধিগ্রহণ করা ছয় একর জমিতে উন্নয়নকাজ চলছে। তবে মূল খননকাজ শুরু হবে ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি। সবকিছু ঠিক থাকলে ওই বছরের শেষ দিকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হতে পারে।
এর আগে ২০১৪ সালে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরতায় কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছিল বাপেক্স। কিন্তু নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছানোর পর ভূগর্ভে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ দেখা দিলে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাবে খননকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ‘ওই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার প্রযুক্তি তখন আমাদের কাছে না থাকায় প্রকল্পটি সফল হয়নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরতায় খননকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’।
গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খননের মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে সরকার ৯০৯ কোটি টাকা ঋণ দেবে এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়নে দেবে ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
কূপ খনন ও রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণের জন্য চীনের সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স। চীনা এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি শ্রীকাইল ডিপ-১ ও মোবারকপুর ডিপ-১ এই দুটি কূপ খনন করবে ৭১৩ কোটি টাকায়। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, সফলভাবে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে এই ক্ষেত্র থেকে প্রায় ২০ বছর দৈনিক অন্তত ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। বারবার পরিচালিত ভূকম্পন জরিপের ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে মোবারকপুরে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সফল হলে এটিই হবে উত্তরবঙ্গের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র।
মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পের পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক এস এ এম মেরাজুল আলম জানান, বর্তমানে জমি উন্নয়ন ও পাইলিংয়ের কাজ চলছে। ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইল নির্মাণের কাজ গত ২৭ জুলাই শুরু হয়েছে, যা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
সুজানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ জানান, গত মার্চে আহমেদপুর মৌজার ছয় একর জমি বাপেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
২০১৪ সালের ব্যর্থতা কাটিয়ে এবার আধুনিক প্রযুক্তি আর উন্নত ড্রিলিং ব্যবস্থা নিয়ে মাঠে নামছে বাপেক্স। ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে গ্যাসের সন্ধান, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। সফল হলে শুধু উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদাই পূরণ হবে না, দেশের সামগ্রিক গ্যাস সংকটেও বড় ভূমিকা রাখবে এই প্রকল্প। তবে এখন অপেক্ষা ২০২৮ সালের দিকে, যখন ড্রিলিং রিগ ঘুরতে শুরু করবে পাবনার মাটিতে।

