দেশ থেকে পান রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে গত এক বছরে। রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় সাড়ে চৌত্রিশ শতাংশ, আর এর পেছনে রপ্তানিকারক সমিতির একাংশের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি সমাধানে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে সৌদি আরবে কার্যরত কৃষি পণ্য আমদানিকারকদের একটি সংগঠন।
গত ত্রিশে মে কৃষি পণ্য আমদানিকারক সমিতি, সৌদি আরব শাখা এই চিঠিটি পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো এবং জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কাছে। চিঠিতে পান রপ্তানি খাতে চলমান সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে অবাধ ও নিরপেক্ষ রপ্তানি পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, রপ্তানিকারক সমিতির শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা কখনোই প্রকৃত অর্থে রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, অথচ তাঁরাই বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে প্রকৃত রপ্তানিকারকদের কার্যক্রমে বাধা তৈরি করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, এফবিসিসিআই ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো সরকারি সংস্থাগুলো রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিলেও সমিতির পক্ষ থেকে আদালতে গিয়ে সেসব উদ্যোগে স্থগিতাদেশ আনার অভিযোগও তোলা হয়েছে চিঠিতে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রতিটি পানের বাস্কেট রপ্তানির বিপরীতে পাঁচশ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, আর সমিতির সদস্য না হলে রপ্তানির অনুমতিই মিলছে না। ফলে নিয়মিত ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, আর অনেকে বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎস থেকে পান সংগ্রহ করছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সমিতির প্রত্যয়নপত্র ছাড়া রপ্তানির প্রয়োজনীয় বিল অব এক্সপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ করা যাচ্ছে না, যার ফলে গোটা রপ্তানি প্রক্রিয়া কার্যত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয়ে—২০২৪-২৫ অর্থবছরে পান রপ্তানি থেকে আয় দাঁড়িয়েছে একুশ দশমিক চুয়াল্লিশ মিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল বত্রিশ দশমিক ঊনষাট মিলিয়ন ডলার।
সাধারণ রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, অতীতে একাধিকবার বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন ও আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে এই বাধ্যতামূলক সদস্যপদ ও প্রত্যয়নপত্র ব্যবস্থা বাতিল হলেও পরবর্তীতে তা আবার নতুন করে চালু করা হয়েছে। এতে নতুন উদ্যোক্তারা এই খাতে প্রবেশই করতে পারছেন না, আর পুরোনো রপ্তানিকারকদের কার্যক্রমও ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে।
চিঠিতে প্রতি চালানে রপ্তানির পরিমাণ সীমিত রাখা, মাসে তিনশ বাস্কেটের বেশি রপ্তানিতে বাধা দেওয়া এবং তালিকায় ঘন ঘন পরিবর্তন এনে হয়রানির অভিযোগও তোলা হয়েছে। এসব কারণে দেশের প্রান্তিক পান চাষিরা তাঁদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পান রপ্তানির পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে চিঠিতে।
সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে চিঠিতে পান রপ্তানি খাতে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে একটি অবাধ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

