বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি একশ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদিয়া আমৃত খান। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন কেবল পরিবেশগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পোশাক শিল্পের টিকে থাকার জন্যও তা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।
আজ রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রযোজ্য ট্যারিফ নির্ধারণ নিয়ে আয়োজিত এক গণশুনানিতে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এই শুনানির আয়োজন করে।
শুনানিতে বিদিয়া আমৃত খান বলেন, নিজে বিদ্যুৎ প্রকৌশলী না হলেও এবং বিজিএমইএ কোনো বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ সংস্থা না হলেও পোশাক শিল্প টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে কারণেই তাঁরা এই আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন একটি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে, আর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দেশের শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের পথে হাঁটতেই হবে।
তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্যকর হতে যাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক কঠোর পরিবেশগত ও করপোরেট জবাবদিহিমূলক বিধিবিধান বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, আর সেসব নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতা এখনই তৈরি করতে হবে রপ্তানিকারকদের। তাঁর ব্যাখ্যায়, ভবিষ্যতে প্রতিটি রপ্তানিযোগ্য পোশাকে যুক্ত থাকবে কিউআর কোড, যা স্ক্যান করে ইউরোপীয় ক্রেতারা জানতে পারবেন পণ্যের সুতার উৎস, উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের হার। এসব শর্ত পূরণ করতে না পারলে ইউরোপের বাজারে দেশের পোশাকের চাহিদা কমে যাবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের হার মাত্র পৌনে দুই শতাংশ, যেখানে প্রতিযোগী দেশগুলো অনেকটাই এগিয়ে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনামে এই হার সাড়ে চুয়াল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি, কম্বোডিয়ায় প্রায় একচল্লিশ শতাংশ, ভারতে ঊনিশ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ষোলো শতাংশ। প্রতিযোগীরা এতটা এগিয়ে থাকতে পারলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে, এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
শিল্পের বর্তমান ব্যয় পরিস্থিতি তুলে ধরে বিদিয়া আমৃত খান বলেন, গত এক বছরে কাস্টমস চার্জ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও শ্রমিকদের সংশ্লিষ্ট নানা খাতের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পনেরো থেকে সতেরো শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপকে যৌক্তিক মনে করছেন না তিনি। তাঁর প্রশ্ন, সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ যখন শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসাহিত করার কথা বলছে, তখন কর বাড়িয়ে দেওয়া নীতিগতভাবে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি সতর্ক করে বলেন, একশ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যাপ্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং তার প্রমাণ দেখাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পোশাক রপ্তানি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে, যা একসময় দেশের এই প্রধান শিল্পকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
তাঁর মতে, পোশাক শিল্পের এই সবুজ রূপান্তর কেবল শিল্প মালিকদের একার পক্ষে সম্ভব নয়—এর জন্য প্রয়োজন সরকারের নীতিগত সহায়তা, যুক্তিসংগত ট্যারিফ কাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম আমদানি সহজীকরণ এবং একটি বিনিয়োগবান্ধব সার্বিক পরিবেশ। শুনানিতে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিদ্যমান নীতিগত বাধা দূর করার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের আহ্বান জানান।
সবশেষে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে হলে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে, নয়তো একদিকে জলবায়ু-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে, অন্যদিকে একশ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যও বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে।

